বাড়ি কিনতে লোন নেওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক কী কী দেখে? হোম লোন অনুমোদনের সম্পূর্ণ গাইড

স্বপ্নের বাড়ির পথে ব্যাঙ্কের আসল হিসাব

নিজের একটি বাড়ি। মধ্যবিত্ত ভারতীয় পরিবারের কাছে এই স্বপ্ন শুধু চার দেওয়ালের নয়, নিরাপত্তা আর সম্মানের প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে আজকের দিনে নগদ টাকায় বাড়ি কেনা খুব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব। তাই অধিকাংশ মানুষকেই ভরসা করতে হয় হোম লোনের উপর। অনেকেই ভাবেন, মাসিক আয় থাকলেই ব্যাঙ্ক লোন দিয়ে দেবে। বাস্তবটা কিন্তু এত সহজ নয়।

বাড়ি কেনার লোন দেওয়ার আগে ব্যাঙ্ক খুব হিসেব করে দেখে নেয় আপনি আদৌ সেই লোন শোধ করার যোগ্য কি না। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে থাকে একাধিক আর্থিক, আইনি এবং ব্যক্তিগত বিষয়। আজকের এই প্রতিবেদনে সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হল, বাড়ি কিনতে লোন নেওয়ার সময় ব্যাঙ্ক আসলে কী কী দেখে এবং কেন দেখে।

আয় কত, সেটা নয় আয় কতটা স্থায়ী সেটাই আসল

হোম লোনের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কের প্রথম প্রশ্ন হয় আপনার আয়ের উৎস কী। আপনি চাকরিজীবী না ব্যবসায়ী, বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন না সরকারি কর্মী, সব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

ধরা যাক, কলকাতার এক বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত রাহুল মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন পান। অন্যদিকে একই আয় আছে কিন্তু অনিয়মিত কাজ করেন এমন একজন ফ্রিল্যান্সারের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক বেশি সাবধান হয়। কারণ ব্যাঙ্ক দেখতে চায় এই আয় আগামী বিশ ত্রিশ বছর ধরে নিয়মিত থাকবে কি না।

চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক সাধারণত শেষ ছয় মাসের বেতন স্লিপ, ফর্ম সোল্লিশ ষোল, আয়কর রিটার্ন দেখে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে গত দুই তিন বছরের লাভ ক্ষতির হিসাব, জিএসটি রিটার্ন, ব্যাংক স্টেটমেন্ট সবই খতিয়ে দেখা হয়।

মাসিক খরচ আর দায়দায়িত্ব কতটা রয়েছে

শুধু আয় থাকলেই চলবে না, ব্যাঙ্ক দেখে আপনার মাসিক খরচ কত। আপনার কি আগে থেকে গাড়ির লোন আছে, পার্সোনাল লোন চলছে, ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া রয়েছে কি না, এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাঙ্ক সাধারণত ধরে নেয়, আপনার মোট মাসিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশের বেশি ইএমআই হওয়া উচিত নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সীমা চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশের মধ্যে থাকে।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, মাসিক আয় পঞ্চাশ হাজার টাকা হলে ব্যাঙ্ক চায় না আপনার সব লোন মিলিয়ে মাসিক ইএমআই পঁচিশ হাজার টাকার বেশি হোক। কারণ সংসারের দৈনন্দিন খরচ চালানোর জন্যও টাকা থাকা দরকার।

ক্রেডিট স্কোর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

আজকের দিনে ক্রেডিট স্কোর ছাড়া লোন পাওয়ার কথা ভাবাই কঠিন। এই স্কোর মূলত আপনার আর্থিক আচরণের রিপোর্ট কার্ড। আগে নেওয়া লোন বা ক্রেডিট কার্ডের বিল আপনি সময়মতো শোধ করেছেন কি না, তার উপর ভিত্তি করেই এই স্কোর তৈরি হয়।

সাধারণভাবে সাতশোর বেশি ক্রেডিট স্কোর থাকলে হোম লোন পাওয়া সহজ হয়। স্কোর কম হলে ব্যাঙ্ক সন্দেহপ্রবণ হয়। অনেক সময় সুদের হারও বাড়িয়ে দেয়, আবার কখনও লোন পুরোপুরি নাকচ করে দেয়।

গ্রামের বা ছোট শহরের অনেক মানুষ এখনও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন না। ফলে তাঁদের কোনও ক্রেডিট ইতিহাস থাকে না। এই ক্ষেত্রেও ব্যাঙ্ক বাড়তি কাগজপত্র দেখে নিশ্চিত হতে চায়।

আপনি কত বছর কাজ করছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ

হোম লোন দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। তাই ব্যাঙ্ক দেখতে চায় আপনি কতদিন ধরে কাজ করছেন। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে সাধারণত অন্তত দুই থেকে তিন বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে সুবিধা হয়। একই সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করলে তা আরও ভালো হিসেবে ধরা হয়।

ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ব্যবসা কতদিন ধরে চলছে, সেই ব্যবসা লাভজনক কি না, বাজারে তার অবস্থান কেমন, সব কিছু বিবেচনায় আসে।

বাড়ির দাম আর আপনার ডাউন পেমেন্ট

ব্যাঙ্ক কখনওই বাড়ির পুরো দাম লোন হিসেবে দেয় না। সাধারণত বাড়ির মোট মূল্যের সত্তর থেকে আশি শতাংশ পর্যন্ত লোন পাওয়া যায়। বাকি টাকা আপনাকে নিজে দিতে হয়, যাকে ডাউন পেমেন্ট বলা হয়।

ব্যাঙ্ক এখানে দেখে, আপনার নিজের পুঁজি কতটা আছে। ধরুন, একটি ফ্ল্যাটের দাম পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। ব্যাঙ্ক যদি আশি শতাংশ লোন দেয়, তাহলে আপনাকে অন্তত দশ লক্ষ টাকা নিজে দিতে হবে।

এই টাকা কোথা থেকে আসছে সেটাও ব্যাঙ্ক জানতে চায়। সঞ্চয়, ফিক্সড ডিপোজিট, প্রভিডেন্ট ফান্ড, পুরনো সম্পত্তি বিক্রির টাকা এসব বৈধ উৎস থেকেই ডাউন পেমেন্ট হওয়া উচিত।

যে বাড়ি কিনছেন তার আইনি অবস্থা

অনেকেই ভাবেন, লোন তো আমার নামে, বাড়ির কাগজপত্র কেন ব্যাঙ্ক এত খুঁটিয়ে দেখে। আসলে ব্যাঙ্কের কাছে ওই বাড়িটাই লোনের নিরাপত্তা।

তাই ব্যাঙ্ক নিশ্চিত হতে চায়, বাড়ির জমির মালিকানা পরিষ্কার কি না, কোনও আইনি ঝামেলা আছে কি না, প্রোমোটারের অনুমোদন ঠিক আছে কি না।

নতুন ফ্ল্যাট হলে ব্যাঙ্ক দেখে প্রোমোটার রাজ্য সরকারের অনুমোদন পেয়েছে কি না, পৌরসভার নকশা পাশ হয়েছে কি না, জমির উপর কোনও মামলা চলছে কি না।

পুরনো বাড়ির ক্ষেত্রে খতিয়ান, দলিল, মিউটেশন সব কিছু যাচাই করা হয়।

বাড়ির অবস্থান আর ভবিষ্যৎ মূল্য

ব্যাঙ্ক শুধু বর্তমান মূল্য নয়, ভবিষ্যতে সেই বাড়ির দাম বাড়বে কি না সেটাও বিবেচনা করে। শহরের কোন এলাকায় বাড়ি, আশেপাশে রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার আছে কি না, সব কিছুই প্রভাব ফেলে।

একটি প্রত্যন্ত এলাকার বাড়ির তুলনায় শহরের ভালো লোকেশনের বাড়ির জন্য লোন পাওয়া সহজ হয়। কারণ প্রয়োজনে ব্যাঙ্ক সেই বাড়ি বিক্রি করে টাকা উদ্ধার করতে পারবে।

আপনার বয়স এবং লোনের মেয়াদ

হোম লোনের মেয়াদ সাধারণত বিশ থেকে ত্রিশ বছর পর্যন্ত হয়। তাই আপনার বর্তমান বয়স খুব গুরুত্বপূর্ণ।

যদি আপনার বয়স পঁচিশ থেকে ত্রিশের মধ্যে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি লোন পাওয়া সহজ। কিন্তু বয়স যদি পঞ্চাশের কাছাকাছি হয়, তাহলে ব্যাঙ্ক লোনের মেয়াদ কমিয়ে দেয়।

কারণ ব্যাঙ্ক চায় আপনি অবসর নেওয়ার আগেই লোন শোধ হয়ে যাক।

সহ আবেদনকারী থাকলে সুবিধা বাড়ে

অনেক ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী একসঙ্গে লোন নিলে সুবিধা হয়। এতে মোট আয় বাড়ে, লোনের পরিমাণও বাড়তে পারে। পাশাপাশি কর ছাড়ের সুবিধাও পাওয়া যায়।

তবে সহ আবেদনকারীর ক্রেডিট স্কোর এবং আয়ের ইতিহাসও সমানভাবে যাচাই করা হয়।

আয়কর রিটার্ন এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট

ব্যাঙ্ক দেখতে চায় আপনি নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন কি না। এতে আপনার আয়ের স্বচ্ছতা প্রমাণ হয়। শেষ ছয় থেকে বারো মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখে ব্যাঙ্ক বুঝতে চায় আপনার টাকা আসা যাওয়ার ধরণ কেমন।

হঠাৎ বড় অঙ্কের টাকা জমা হলে তার উৎস জানতে চাওয়া হয়।

সরকারি ভর্তুকি এবং সুবিধা

ভারতে প্রথমবার বাড়ি কিনলে কিছু সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া যায়। ব্যাঙ্ক দেখে আপনি সেই সুবিধার যোগ্য কি না। আয় সীমা, বাড়ির মাপ, অবস্থান সব কিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

লোন নেওয়ার আগে কী করলে সুবিধা হবে

হোম লোনের জন্য আবেদন করার আগে কিছু বিষয় মেনে চললে অনুমোদন সহজ হয়। অপ্রয়োজনীয় লোন বন্ধ করা, ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া শোধ করা, নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া এগুলো খুবই জরুরি।

একই সঙ্গে বাড়ির কাগজপত্র আগেভাগেই ভালো করে যাচাই করে নেওয়া উচিত।

শেষ কথা

বাড়ি কেনার লোন শুধুই একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি বহু বছরের দায়িত্ব। তাই ব্যাঙ্ক যতই প্রশ্ন করুক, সেই প্রশ্নগুলোর পিছনে যুক্তি আছে।

আপনি যদি নিজের আয়, খরচ, কাগজপত্র সব কিছু পরিষ্কার রাখেন, তাহলে হোম লোন পাওয়া কঠিন নয়। পরিকল্পনা করে এগোলে স্বপ্নের বাড়ি আপনার নাগালের মধ্যেই থাকবে।

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন

Know more: শেয়ার বাজারে সর্বনিম্ন কত টাকা বিনিয়োগ করা যায়? নতুনদের জন্য সম্পূর্ণ গাইড

Know more: স্টক মার্কেটে কীভাবে বিনিয়োগ করবেন সম্পূর্ণ সহজ গাইড নতুনদের জন্য

2 thoughts on “বাড়ি কিনতে লোন নেওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক কী কী দেখে? হোম লোন অনুমোদনের সম্পূর্ণ গাইড”

Leave a Comment