শেয়ার বাজার নিয়ে কথা উঠলেই ভারতের বহু বাড়িতে এখনও একটি শব্দ ঘুরে ফিরে আসে—এজেন্ট। কেউ বলেন, এজেন্টের কথায় শেয়ার কিনে ক্ষতিতে পড়েছেন। কেউ আবার বলেন, ঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ দিয়ে এজেন্টই তাঁকে লাভের মুখ দেখিয়েছেন।
কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা থাকে একটাই—শেয়ার মার্কেটের এজেন্টরা আসলে কীভাবে কমিশন পান? তাঁরা কি আমাদের ক্ষতির উপরেও টাকা রোজগার করেন? নাকি শুধু লাভ হলেই তাঁদের আয় হয়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই আজকের বিস্তারিত আলোচনা।
শেয়ার মার্কেটের এজেন্ট বলতে কাদের বোঝায়
আগে বোঝা দরকার, শেয়ার মার্কেটের এজেন্ট বলতে কাদের বোঝানো হয়। এক সময় এজেন্ট মানেই ছিল সেই ব্যক্তি, যিনি বিনিয়োগকারীর হয়ে শেয়ার কেনাবেচা করতেন। আজ ছবিটা একটু বদলেছে।
বর্তমানে এজেন্ট বলতে বোঝানো হয়—
স্টক ব্রোকার
সাব-ব্রোকার
রিমিসিয়ার
ফাইনান্সিয়াল অ্যাডভাইজার
সবাইকে এক কথায় এজেন্ট বলা হলেও, তাঁদের কাজের ধরন আর আয়ের উৎস এক নয়।
আগেকার দিনের এজেন্ট ব্যবস্থা
নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত শেয়ার বাজার ছিল মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক। গ্রামের বা মফস্বলের মানুষ সরাসরি বাজারে ঢোকার সুযোগ পেতেন না। তখন এজেন্টই ছিলেন ভরসা।
কলকাতা, মুম্বই বা দিল্লির কোনও ব্রোকারের সঙ্গে যুক্ত একজন স্থানীয় এজেন্ট গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে শেয়ার কেনাবেচা করতেন। বিনিয়োগকারী জানতেন না শেয়ার কখন কেনা হল, কখন বিক্রি হল। সবটাই নির্ভর করত এজেন্টের উপর।
সেই সময় এজেন্টরা মূলত কমিশনের ভিত্তিতেই কাজ করতেন।
কমিশনের মূল উৎস কোথা থেকে আসে
শেয়ার মার্কেটের এজেন্টদের আয়ের প্রধান উৎস হল ব্রোকারেজ কমিশন। যখন কোনও বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনেন বা বিক্রি করেন, তখন সেই লেনদেনের উপর একটি নির্দিষ্ট চার্জ কাটা হয়।
এই চার্জের একটি অংশ যায় স্টক ব্রোকারের কাছে, আর তার একটি অংশ এজেন্ট বা সাব-ব্রোকার পান।
অর্থাৎ আপনি যখন শেয়ার কেনাবেচা করেন, তখন সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এজেন্ট কমিশন পান।
ট্রেড যত বেশি, কমিশন তত বেশি
এজেন্টদের আয়ের সঙ্গে একটি বিষয় সরাসরি যুক্ত—লেনদেনের পরিমাণ। আপনি যত বেশি শেয়ার কেনাবেচা করবেন, তত বেশি ব্রোকারেজ কাটবে, আর তত বেশি কমিশন যাবে এজেন্টের পকেটে।
এই কারণেই অনেক সময় দেখা যায়, কিছু এজেন্ট বারবার ট্রেড করতে উৎসাহ দেন। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের বদলে ঘনঘন কেনাবেচার পরামর্শ দেন।
এখানেই বিনিয়োগকারীদের সচেতন হওয়া জরুরি।
লাভ হোক বা ক্ষতি, কমিশন ঠিকই আসে
এটা অনেকেরই অজানা সত্য। আপনি শেয়ার বাজারে লাভ করুন বা ক্ষতিতে পড়ুন—এজেন্টের কমিশন কিন্তু কাটা হয়।
ধরুন আপনি একটি শেয়ার কিনলেন এবং পরে ক্ষতিতে বিক্রি করলেন। তবুও কেনা এবং বিক্রি—দু’বারই ব্রোকারেজ কাটা হবে। সেই ব্রোকারেজ থেকেই এজেন্ট তাঁর কমিশন পান।
এই কারণেই অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, এজেন্টের লাভ আর তাঁদের লাভ এক জায়গায় দাঁড়ায় না।
নতুন ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খুললেও কমিশন
আজকের দিনে এজেন্টদের আয়ের আরেকটি বড় উৎস হল নতুন ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খোলা। অনেক ব্রোকার সংস্থা এজেন্টদের প্রতি অ্যাকাউন্টের জন্য নির্দিষ্ট কমিশন দেয়।
গ্রাম বা ছোট শহরে এখনও অনেক মানুষ নিজেরা অনলাইন ফর্ম পূরণ করতে স্বচ্ছন্দ নন। সেখানে এজেন্টই ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খুলে দেন। এর বিনিময়ে তাঁরা এককালীন বা মাসিক কমিশন পান।
আইপিও আর মিউচুয়াল ফান্ড থেকেও আয়
শেয়ার কেনাবেচা ছাড়াও অনেক এজেন্ট আইপিও এবং মিউচুয়াল ফান্ড বিক্রি করে কমিশন পান।
কোনও বড় আইপিও আসলে অনেক এজেন্ট গ্রাহকদের ফোন করেন। কেউ সরাসরি বলেন, এটা খুব ভালো সুযোগ। কেউ বলেন, না নিলে পরে আফসোস হবে।
এই আইপিও বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করালে এজেন্ট নির্দিষ্ট শতাংশ কমিশন পান।
কমিশন কি বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে সরাসরি নেওয়া হয়
অনেক ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারী বুঝতেই পারেন না যে তিনি কমিশন দিচ্ছেন। কারণ কমিশন আলাদা করে দিতে হয় না। এটি লেনদেনের মধ্যেই কেটে নেওয়া হয়।
কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এজেন্ট সরাসরি পরিষেবা চার্জও নেন। বিশেষ করে যাঁরা ব্যক্তিগত পরামর্শ দেন, তাঁরা মাসিক বা বার্ষিক ফি নেন।
শহর ও গ্রামের কমিশন ব্যবস্থার পার্থক্য
শহরে অনলাইন ট্রেডিং বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি এজেন্টের ভূমিকা কিছুটা কমেছে। কিন্তু গ্রাম ও মফস্বলে এখনও এজেন্টের উপর নির্ভরতা বেশি।
সেখানে অনেক সময় বিনিয়োগকারী পুরোপুরি এজেন্টের কথায় শেয়ার কেনেন। কমিশনের বিষয়টি স্পষ্ট না হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
কিছু এজেন্ট কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার সাজেস্ট করেন
এখানেই একটি সংবেদনশীল প্রশ্ন আসে। কিছু এজেন্ট কেন বারবার ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ার বা ঘনঘন ট্রেড করার পরামর্শ দেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কারণটা অনেক সময় কমিশন নির্ভর। বেশি লেনদেন মানে বেশি ব্রোকারেজ, আর তার থেকেই বেশি কমিশন।
তবে সব এজেন্ট এক রকম নন। অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান এবং গ্রাহকের লাভকেই অগ্রাধিকার দেন।
নিয়মকানুন কী বলছে
বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি এজেন্টদের উপর কিছু নিয়ম আরোপ করেছে। কমিশন কাঠামো আগের তুলনায় অনেক স্বচ্ছ হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদেরও বলা হচ্ছে, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব খরচ বুঝে নিতে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীর কী করা উচিত
এজেন্টের পরামর্শ নেওয়া দোষের নয়। কিন্তু নিজের দায়িত্ব নিজের কাঁধেই নিতে হবে।
কীভাবে কমিশন কাটা হচ্ছে তা জেনে নেওয়া
ঘনঘন ট্রেডের পরামর্শে সতর্ক থাকা
লাভ-ক্ষতির হিসেব নিজে বোঝার চেষ্টা করা
এই বিষয়গুলো মেনে চললে এজেন্টের কমিশন নিয়ে অযথা ভয় থাকবে না।
এজেন্ট কি পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত
সব এজেন্ট খারাপ—এই ধারণা যেমন ভুল, তেমনই অন্ধ বিশ্বাসও বিপজ্জনক। সঠিক এজেন্ট সঠিক পথ দেখাতে পারেন, বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য।
কিন্তু কমিশনের কাঠামো না বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বড় ভুল।
শেষ কথা
শেয়ার মার্কেটের এজেন্টরা মূলত কমিশনের মাধ্যমেই আয় করেন—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ট্রেড যত বেশি, কমিশন তত বেশি। লাভ হোক বা ক্ষতি, কমিশন আসে লেনদেন থেকেই।
এই বাস্তবতা জানলে বিনিয়োগকারী অনেক বেশি সচেতন হতে পারেন। এজেন্টের পরামর্শ নিন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের বুদ্ধি ব্যবহার করুন।
কারণ শেষ পর্যন্ত শেয়ার বাজারে লাভ বা ক্ষতির দায়িত্ব আপনারই।
গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
Know more: বন্ড বলতে কী বোঝায়? বন্ড কিভাবে কাজ করে? নিরাপদ বিনিয়োগের সহজ ব্যাখ্যা
know more; অবসরকালীন সময়ের জন্য সঞ্চয় কিভাবে করবেন? নিরাপদ ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ গাইড

আমি Samapti Sarkar। ব্যক্তিগত ফিনান্স, স্টক মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড ও স্মার্ট সেভিংস নিয়ে লেখালেখি করি। গত কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ সম্পর্কিত পড়াশোনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখা তথ্য পাঠকদের জন্য সহজ ভাষায় তুলে ধরছি। এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিটি কনটেন্ট প্রস্তুত করা হয় গবেষণা, ডেটা ও নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করে। পাঠকদের আর্থিক জ্ঞান বৃদ্ধি ও সঠিক তথ্য দেওয়াই আমার লক্ষ্য।
2 thoughts on “শেয়ার মার্কেটের এজেন্টরা কীভাবে কমিশন পান? বিনিয়োগকারীদের জানা জরুরি সম্পূর্ণ সত্য”