অপ্রয়োজনীয় ঋণের বোঝা কীভাবে কমাবেন বাস্তব জীবনে ঋণমুক্ত হওয়ার সম্পূর্ণ গাইড

ভারতীয় বাস্তবতায় ঋণমুক্ত জীবনের দিকে ধাপে ধাপে পথচলা

আজকের দিনে ঋণ শব্দটা আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে অনেক সময় বুঝতেই পারি না কোনটা প্রয়োজন, আর কোনটা অপ্রয়োজনীয়। মোবাইল ফোন কিনতে ইএমআই, উৎসবের কেনাকাটায় ক্রেডিট কার্ড, বন্ধুর বিয়েতে খরচ চালাতে পার্সোনাল লোন। ধীরে ধীরে এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলো মিলিয়ে একটি বড় আর ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। মাসের শেষে হাতে টাকা থাকে না, কিন্তু ঋণের কিস্তি ঠিকই কেটে যায়।

এই লেখাটি তাদের জন্য, যারা মনে মনে বুঝতে শুরু করেছেন যে ঋণের চাপ বাড়ছে, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। এখানে কোনো উপদেশের ভঙ্গি নেই, নেই কঠিন আর্থিক শব্দের ভিড়। আছে বাস্তব অভিজ্ঞতা, ভারতীয় মধ্যবিত্ত জীবনের চেনা গল্প, আর ধীরে ধীরে ঋণের বোঝা কমানোর বাস্তব পথ।

ঋণ ভালো না খারাপ
প্রথমেই একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। সব ঋণ খারাপ নয়। কিছু ঋণ জীবনের উন্নতির জন্য প্রয়োজন। যেমন বাড়ি কেনার ঋণ, পড়াশোনার ঋণ বা ব্যবসা শুরু করার ঋণ। এগুলো ভবিষ্যতে আয় বাড়াতে সাহায্য করে।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ঋণ নেওয়া হয় জীবনযাত্রার বিলাসিতা বজায় রাখতে। দামি ফোন, অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ, লোক দেখানো কেনাকাটা। এগুলো থেকে ভবিষ্যতে কোনো আয় আসে না, শুধু চাপ বাড়ে। এই ধরনের ঋণই অপ্রয়োজনীয় ঋণ।

অপ্রয়োজনীয় ঋণ কীভাবে চুপিচুপি ঢুকে পড়ে
অপ্রয়োজনীয় ঋণ কখনো একদিনে আসে না। এটা আসে ধীরে ধীরে। আজ একটা ইএমআই, কাল একটা ক্রেডিট কার্ড বিল, পরশু আরেকটা ছোট লোন। প্রতিটা সিদ্ধান্ত তখন খুব সাধারণ মনে হয়।

ধরুন আপনি একটি মোবাইল ফোন কিনলেন ইএমআইতে। ভাবলেন মাসে দু হাজার টাকা তেমন কিছু নয়। কিছুদিন পর একটি অনলাইন সেলে আবার কেনাকাটা করলেন ক্রেডিট কার্ডে। মাস শেষে বিল বাড়ল। বিল মেটাতে গিয়ে আবার পার্সোনাল লোন। এইভাবে ঋণের জাল তৈরি হয়।

ভারতে এখন ঋণ নেওয়া খুব সহজ। কেওয়াইসি, আধার, প্যান থাকলেই মিনিটে লোন। সহজলভ্য হওয়াটাই সবচেয়ে বড় ফাঁদ।

ঋণের চাপ বোঝার প্রথম ধাপ
ঋণ কমাতে গেলে আগে স্বীকার করতে হবে যে সমস্যা আছে। অনেকেই চোখ বন্ধ করে থাকেন। মনে করেন সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে সময়ের সঙ্গে সুদ বাড়ে, চাপ বাড়ে।

একদিন বসে সব ঋণের হিসাব লিখে ফেলুন। কতগুলো লোন, কোনটার সুদ কত, মাসে কত কিস্তি যাচ্ছে। প্রথমে ভয় লাগতে পারে। কিন্তু এই ভয়টাই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।

অনেক মানুষ এই হিসাবটাই করেন না। তারা শুধু জানেন মাসে টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণটা বোঝেন না।

কোন ঋণ আগে শোধ করবেন
সব ঋণ একসঙ্গে শোধ করা সম্ভব নয়। তাই অগ্রাধিকার ঠিক করা খুব জরুরি। সাধারণভাবে যেসব ঋণের সুদ বেশি, সেগুলো আগে শোধ করা উচিত। যেমন ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া, পার্সোনাল লোন, অ্যাপ ভিত্তিক ইনস্ট্যান্ট লোন।

এই ধরনের ঋণের সুদ অনেক সময় বছরে তিরিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত হয়। এগুলো যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা দরকার।

বাড়ির ঋণ বা শিক্ষা ঋণের সুদ তুলনামূলক কম। এগুলো পরে ধীরে ধীরে সামলানো যায়।

একাধিক ঋণ থাকলে কী করবেন
অনেকের একসঙ্গে তিন চারটা ঋণ থাকে। এই অবস্থায় মানসিক চাপ খুব বেশি হয়। কেউ কেউ আবার এক ঋণ শোধ করতে আরেক ঋণ নেন। এতে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং জটিলতা বাড়ে।

এই পরিস্থিতিতে এক জায়গায় ঋণ সংহত করার কথা ভাবা যেতে পারে। মানে একাধিক উচ্চ সুদের ঋণ বন্ধ করে একটি কম সুদের ঋণে নিয়ে আসা। তবে এখানেও সাবধানতা দরকার। নতুন ঋণের শর্ত ভালোভাবে না বুঝলে আবার ফাঁদে পড়া যায়।

খরচের লাগাম টানার বাস্তবতা
ঋণ কমানোর কথা বললেই সবাই বলে খরচ কমান। কিন্তু বাস্তবে খরচ কমানো সহজ নয়। কারণ আমাদের খরচের অনেকটাই অভ্যাস থেকে আসে।

প্রথমে অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো চিহ্নিত করুন। প্রতিদিন বাইরে খাওয়া, বারবার অনলাইন অর্ডার, অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন। এগুলো ছোট মনে হলেও মাস শেষে বড় অঙ্ক হয়।

একেবারে সব বন্ধ না করে ধীরে ধীরে কমান। বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিন, যাতে সেটা দীর্ঘদিন ধরে রাখা যায়।

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সতর্কতা
ক্রেডিট কার্ড অনেক সুবিধা দেয়, কিন্তু ভুল ব্যবহার করলে এটা ঋণের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে দাঁড়ায়। সবচেয়ে বড় ভুল হল মিনিমাম ডিউ পরিশোধ করা। এতে আপনি ভাবেন বিল মিটে গেছে, কিন্তু আসলে সুদের চক্র শুরু হয়।

যদি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে চেষ্টা করুন পুরো বিল মেটাতে। যদি না পারেন, তাহলে নতুন খরচ বন্ধ করুন যতক্ষণ না পুরনো বকেয়া শেষ হচ্ছে।

একাধিক ক্রেডিট কার্ড থাকলে সংখ্যা কমানোও ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।

ইএমআই সংস্কৃতি আর বাস্তবতা
ভারতে এখন ইএমআই সংস্কৃতি খুব জনপ্রিয়। সব কিছু ইএমআইতে পাওয়া যায়। কিন্তু ইএমআই মানেই সহজ নয়।

ইএমআই মানে ভবিষ্যতের আয় আজ থেকেই বন্ধক রাখা। আজ আপনি স্বচ্ছন্দে কিস্তি দিচ্ছেন, কিন্তু ভবিষ্যতে আয় কমলে চাপ বাড়বে।

প্রতিটি ইএমআই নেওয়ার আগে ভাবুন, এই জিনিসটা না কিনলে আপনার জীবন থেমে যাবে কি না। উত্তর যদি না হয়, তাহলে অপেক্ষা করাই ভালো।

আয়ের দিকেও নজর দেওয়া দরকার
শুধু খরচ কমালেই ঋণ কমে না। আয়ের দিকেও নজর দিতে হয়। অনেক সময় সমস্যা খরচে নয়, আয়ে।

বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ আগের চেয়ে বেশি। ফ্রিল্যান্স কাজ, পার্টটাইম, নিজের দক্ষতা দিয়ে কিছু করা। একেবারে বড় কিছু না হলেও অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা ঋণ শোধে বড় সাহায্য করতে পারে।

এখানে দ্রুত ধনী হওয়ার ফাঁদে না পড়ে বাস্তবসম্মত পথ বেছে নেওয়া জরুরি।

পরিবারের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা
ঋণ অনেক সময় লুকিয়ে রাখা হয়। বিশেষ করে পরিবার থেকে। কিন্তু এতে সমস্যা আরও বাড়ে। পরিবারকে জানালে হয়তো প্রথমে অস্বস্তি হবে, কিন্তু পরে সহযোগিতা পাওয়া যায়।

অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা খরচ কমাতে সাহায্য করেন, মানসিক চাপ ভাগ করে নেন। একা লড়াই করার চেয়ে একসঙ্গে লড়াই করা সহজ।

নতুন ঋণ নেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন
ঋণ কমানোর পথে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে নতুন ঋণের প্রলোভনে। তখন নিজেকে কয়েকটা প্রশ্ন করুন। এই ঋণ না নিলে কী হবে। এটা কি সত্যিই প্রয়োজন। এর ফলে ভবিষ্যতে চাপ বাড়বে কি না।

এই প্রশ্নগুলো নিজের কাছে সৎভাবে করলে অনেক সিদ্ধান্ত নিজে থেকেই বদলে যায়।

মানসিক দিকটা অবহেলা করবেন না
ঋণের চাপ শুধু পকেটেই নয়, মাথার ভেতরেও থাকে। ঘুমের সমস্যা, বিরক্তি, আত্মবিশ্বাসের অভাব। এগুলো খুব সাধারণ।

নিজেকে দোষারোপ না করে পরিস্থিতি মেনে নিয়ে ধাপে ধাপে এগোনো জরুরি। আজ একটু কম কিস্তি বাকি হলেই সেটাকে সাফল্য হিসেবে দেখুন।

ঋণমুক্ত জীবনের স্বাদ
যখন ধীরে ধীরে ঋণ কমে আসে, তখন তার প্রভাব শুধু ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নয়, জীবনের প্রতিটি অংশে পড়ে। রাতে ঘুম ভালো হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

ঋণমুক্ত হওয়া মানে বিলাসিতা নয়, মানে স্বাধীনতা। নিজের আয়ের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ।

শেষ কথা
অপ্রয়োজনীয় ঋণের বোঝা কমানো কোনো একদিনের কাজ নয়। এটা একটি প্রক্রিয়া। ভুল সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোনো।

এই লেখার উদ্দেশ্য আপনাকে ভয় দেখানো নয়, বরং বাস্তব চিত্র দেখানো। ঋণ নেওয়া সহজ, কিন্তু ঋণ থেকে বেরোনো ধৈর্যের পরীক্ষা। আজ যদি আপনি প্রথম পদক্ষেপ নেন, আগামী দিনের আপনি তার জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দেবেন।

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন

know more: নতুনদের জন্য শেয়ার বাজার গাইড সহজ ভাষায় বিনিয়োগ শুরু করার সম্পূর্ণ পথনির্দেশ