জিরো ডাউনপেমেন্টে ২ লক্ষ টাকার গাড়ি কিনলে কত টাকা ইন্টারেস্ট দিতে হয়

ব্যাঙ্ক কত পরিমাণ সুদ নেয়, আসল খরচটা কোথায় লুকিয়ে থাকে

আজকের দিনে গাড়ি আর বিলাসিতা নয়, অনেকের কাছেই তা প্রয়োজন। অফিস যাতায়াত হোক কিংবা পরিবারের প্রয়োজনে বাইরে বেরোনো, ছোট বাজেটের গাড়ির চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জিরো ডাউনপেমেন্ট গাড়ি লোনের বিজ্ঞাপন। মাত্র শূন্য টাকা দিয়ে গাড়ি বাড়িতে নিয়ে যান, এই ধরনের অফার শুনতে যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে বিষয়টা ঠিক ততটাই জটিল।

অনেকেই জানতে চান, যদি জিরো ডাউনপেমেন্টে ২ লক্ষ টাকার একটি গাড়ি কেনা হয়, তাহলে ব্যাঙ্ক আসলে কত টাকা সুদ নেয়। মাসে কত ইএমআই দিতে হয়। মোট ইন্টারেস্ট কত দাঁড়ায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই ডিল আদৌ লাভজনক কি না।

এই প্রতিবেদনে আমরা সহজ ভাষায়, বাস্তব উদাহরণ দিয়ে পুরো বিষয়টা খুলে বলব।

জিরো ডাউনপেমেন্ট গাড়ি লোন আসলে কী

সাধারণভাবে গাড়ি কেনার সময় মোট দামের কিছু অংশ আগাম দিতে হয়। একে বলা হয় ডাউনপেমেন্ট। কিন্তু জিরো ডাউনপেমেন্ট লোনে ব্যাঙ্ক বা ফিনান্স সংস্থা গাড়ির পুরো দামটাই লোন হিসেবে দেয়।

ধরা যাক গাড়ির এক্স শোরুম দাম ২ লক্ষ টাকা।
জিরো ডাউনপেমেন্ট হলে আপনাকে এক টাকাও আগাম দিতে হবে না। পুরো ২ লক্ষ টাকার উপরই লোন নেওয়া হবে।

কিন্তু এখানেই একটি বড় ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। অনেকেই মনে করেন, আগাম টাকা না দিতে হলে খরচ কমে যায়। বাস্তবে ঠিক উল্টোটা ঘটে।

২ লক্ষ টাকার গাড়িতে ব্যাঙ্ক সাধারণত কত সুদ নেয়

ভারতে গাড়ি লোনের সুদের হার নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের উপর।

ক্রেডিট স্কোর
আয়ের উৎস
লোনের সময়কাল
গাড়ি নতুন না পুরনো
ডাউনপেমেন্ট আছে কি না

২০২৫ সালের বাস্তব বাজার পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলো সাধারণত ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নেয়। কিন্তু জিরো ডাউনপেমেন্ট হলে এই হার অনেক সময় বেড়ে যায়।

জিরো ডাউনপেমেন্ট লোনে সুদের হার সাধারণত
১০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে

কারণ ব্যাঙ্কের ঝুঁকি এখানে বেশি।

বাস্তব হিসাব করে বোঝা যাক ইন্টারেস্ট কত দাঁড়ায়

এবার সরাসরি হিসাবের কথায় আসা যাক।

গাড়ির দাম
২ লক্ষ টাকা

ডাউনপেমেন্ট
শূন্য টাকা

লোনের পরিমাণ
২ লক্ষ টাকা

সুদের হার
ধরা হল ১১ শতাংশ বার্ষিক

লোনের সময়কাল
৫ বছর অর্থাৎ ৬০ মাস

এই পরিস্থিতিতে মাসিক ইএমআই প্রায়
৪ হাজার ৩৫০ টাকার কাছাকাছি

এখন প্রশ্ন হলো, মোট কত টাকা ব্যাঙ্ককে ফেরত দিতে হবে।

৪ হাজার ৩৫০ টাকা গুণ ৬০ মাস
মোট ফেরত দিতে হবে প্রায়
২ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা

অর্থাৎ
শুধু সুদ হিসেবেই দিতে হচ্ছে প্রায়
৬১ হাজার টাকা

এটাই জিরো ডাউনপেমেন্টের আসল খরচ।

একই গাড়িতে যদি ডাউনপেমেন্ট দিতেন তাহলে কী হতো

এবার তুলনা করা যাক।

ধরা যাক আপনি ২০ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিলেন।
অর্থাৎ ৪০ হাজার টাকা আগাম দিলেন।

লোনের পরিমাণ দাঁড়াল
১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা

সুদের হার একটু কমে গেল
ধরা হল ৯ শতাংশ

সময়কাল একই ৫ বছর

এই ক্ষেত্রে মাসিক ইএমআই হবে প্রায়
৩ হাজার ৩২০ টাকা

মোট ফেরত দিতে হবে
প্রায় ১ লক্ষ ৯৯ হাজার টাকা

এখানে সুদ পড়ছে মাত্র
৩৯ হাজার টাকার মতো

অর্থাৎ জিরো ডাউনপেমেন্টের তুলনায় প্রায়
২২ হাজার টাকা কম সুদ

তাহলে মানুষ জিরো ডাউনপেমেন্ট কেন নেয়

এই প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক।

কারণ অনেকের কাছেই এককালীন টাকা জোগাড় করা কঠিন।
নতুন চাকরি
ছোট ব্যবসা
হঠাৎ গাড়ির প্রয়োজন
পারিবারিক চাপ

এই পরিস্থিতিতে জিরো ডাউনপেমেন্ট একটা সহজ রাস্তা বলে মনে হয়।

বিশেষ করে ছোট শহর ও মফস্বলে অনেক ফিনান্স কোম্পানি খুব সহজ শর্তে এই লোন দেয়।

বিজ্ঞাপনে যে কথাগুলো বলা হয় না

জিরো ডাউনপেমেন্টের বিজ্ঞাপনে সাধারণত বলা হয়
শূন্য টাকা দিয়ে গাড়ি
দ্রুত লোন অনুমোদন
সহজ কাগজপত্র

কিন্তু যেগুলো বলা হয় না, সেগুলো হল

উচ্চ সুদের হার
বেশি ইএমআই
প্রসেসিং ফি বেশি
ইনস্যুরেন্স ও অন্যান্য চার্জ লোনে যোগ হয়ে যায়

অনেক সময় অন রোড প্রাইস ২ লক্ষ হলেও, লোনের অঙ্ক দাঁড়িয়ে যায় ২ লক্ষ ২০ হাজার বা তারও বেশি।

প্রসেসিং ফি ও অন্যান্য লুকোনো খরচ

ব্যাঙ্ক বা ফিনান্স কোম্পানি শুধু সুদ নিয়েই থেমে থাকে না।

প্রসেসিং ফি
সাধারণত লোনের ১ থেকে ২ শতাংশ

হাইপোথেকেশন চার্জ
ফাইল চার্জ
ডকুমেন্টেশন চার্জ

এই সব মিলিয়ে অতিরিক্ত ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হয়ে যেতে পারে।

জিরো ডাউনপেমেন্ট লোনে এই চার্জগুলো তুলনামূলক বেশি হয়।

ক্রেডিট স্কোরের উপর কী প্রভাব পড়ে

জিরো ডাউনপেমেন্টে পুরো টাকার লোন নেওয়া মানে আপনার উপর ঋণের চাপ বেশি।

ইএমআই সময়মতো না দিলে
ক্রেডিট স্কোর দ্রুত খারাপ হয়

ভবিষ্যতে
বাড়ি লোন
পার্সোনাল লোন
ক্রেডিট কার্ড

সব ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হতে পারে।

ছোট গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে জিরো ডাউনপেমেন্ট কতটা যুক্তিযুক্ত

২ লক্ষ টাকার গাড়ি সাধারণত
এন্ট্রি লেভেল
ছোট হ্যাচব্যাক
বা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি

এই ধরনের গাড়ির ক্ষেত্রে জিরো ডাউনপেমেন্টে সুদের বোঝা অনেক সময় গাড়ির ভ্যালুর তুলনায় বেশি হয়ে যায়।

৫ বছর পর গাড়ির রিসেল ভ্যালু কমে যায়
কিন্তু লোনের চাপ থেকে যায়

এই জায়গায় অনেকেই আর্থিক সমস্যায় পড়েন।

কারা জিরো ডাউনপেমেন্ট নিতে পারেন

সবাইয়ের জন্য এই লোন খারাপ নয়।

যাঁরা নিতে পারেন
যাদের আয় স্থিতিশীল
যাদের চাকরি নিরাপদ
যাদের মাসিক বাজেটে ইএমআই সহজে ফিট হয়
যাদের জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি দরকার

তাঁদের ক্ষেত্রে হিসাব বুঝে নেওয়া গেলে জিরো ডাউনপেমেন্ট নেওয়া যেতে পারে।

কারা এই লোন এড়িয়ে চলবেন

যাদের আয় অনিয়মিত
যাদের উপর আগে থেকেই লোন আছে
যাদের মাসিক খরচ বেশি
যাদের জরুরি সঞ্চয় নেই

এই শ্রেণির মানুষদের জন্য জিরো ডাউনপেমেন্ট বড় ঝুঁকি।

কীভাবে সুদের বোঝা কমানো যায়

কিছু সহজ উপায় রয়েছে।

সম্ভব হলে অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিন
লোনের সময়কাল কম রাখুন
একাধিক ব্যাঙ্কের অফার তুলনা করুন
ডিলারের কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস করবেন না
সব চার্জ লিখিতভাবে জেনে নিন

এই কয়েকটি সিদ্ধান্তই আপনাকে হাজার হাজার টাকা বাঁচাতে পারে।

শেষ কথা

জিরো ডাউনপেমেন্টে ২ লক্ষ টাকার গাড়ি কেনা শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে তার খরচ অনেক বেশি। সুদের অঙ্ক প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, যা গাড়ির দামের তুলনায় কম নয়।

গাড়ি কেনার আগে আবেগ নয়, হিসাবকে গুরুত্ব দেওয়া সবচেয়ে জরুরি। আজ একটু কষ্ট করে ডাউনপেমেন্ট জোগাড় করতে পারলে, আগামী পাঁচ বছর অনেকটা নিশ্চিন্তে কাটানো সম্ভব।

সঠিক সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের আর্থিক চাপ থেকে আপনাকে বাঁচাতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন

Know more: অপ্রয়োজনীয় ঋণের বোঝা কীভাবে কমাবেন বাস্তব জীবনে ঋণমুক্ত হওয়ার সম্পূর্ণ গাইড

Know more: মিউচুয়াল ফান্ডে লক্ষ্মীলাভ! চাই সঠিক পরিকল্পনা ও ধৈর্য

1 thought on “জিরো ডাউনপেমেন্টে ২ লক্ষ টাকার গাড়ি কিনলে কত টাকা ইন্টারেস্ট দিতে হয়”

Leave a Comment