শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সঠিক সময় কখন জানা জরুরি বিষয়গুলো

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই। কখন বিনিয়োগ করব। বাজার উঠলে না নামলে। আজ ঢুকব নাকি অপেক্ষা করব। এই দ্বিধা শুধু নতুনদের নয়, বহু অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীর মধ্যেও কাজ করে। বাস্তবে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সঠিক সময় বলে কোনও জাদুকরী মুহূর্ত নেই। কিন্তু কিছু বাস্তব নিয়ম ও মানসিক প্রস্তুতি আছে, যেগুলো মানলে ভুল সময়ে ঢোকার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

ভারতের মতো দেশে, যেখানে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় সীমিত, সেখানে বিনিয়োগের সময় ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শেয়ার বাজারে টাকা ঢোকানোর আগে সময়, পরিস্থিতি এবং নিজের অবস্থান বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

শেয়ার বাজারে সময়ের চেয়ে মানসিক প্রস্তুতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ

অনেকেই ভাবেন বাজার পড়লে বিনিয়োগ করতে হবে, বাজার উঠলে নয়। কথাটা আংশিক ঠিক। কিন্তু তার থেকেও বড় বিষয় হল আপনার মানসিক প্রস্তুতি। আপনি কি জানেন বাজার পড়লে আপনার বিনিয়োগ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। আপনি কি সেটা দেখে ভয় না পেয়ে অপেক্ষা করতে পারবেন।

যদি উত্তর না হয়, তাহলে বাজার পড়লেও আপনার জন্য সেটি সঠিক সময় নয়। আবার বাজার খুব ভালো চললেও, আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদে থাকতে প্রস্তুত থাকেন, তাহলেও বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

শেয়ার বাজারে সময় নির্ধারণের আগে নিজের লক্ষ্য পরিষ্কার করা দরকার। এই টাকা আপনি কিসের জন্য রাখছেন। সন্তানের পড়াশোনা, বাড়ি কেনা, অবসর জীবন, না শুধুই সঞ্চয় বাড়ানো।

একবারে নয়, সময়কে ভাগ করে বিনিয়োগ

ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল হল একদিনে সব টাকা ঢেলে দেওয়া। বাজার পড়েছে শুনে অনেকে হঠাৎ বড় অঙ্ক বিনিয়োগ করেন। আবার বাজার একটু নামতেই আতঙ্কে বিক্রি করে দেন।

আসলে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সেরা সময় হল নিয়মিত সময় ধরে বিনিয়োগ করা। একে বলা হয় ধাপে ধাপে বিনিয়োগ। এতে বাজার ওঠানামার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

ধরুন একজন বেসরকারি কর্মচারী প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন। তিনি যদি বাজার পড়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত বিনিয়োগ করেন, তাহলে দীর্ঘ সময়ে তার গড় কেনার দাম অনেক ভালো থাকবে।

বাজার পড়লে কেন ভয় পাওয়া উচিত নয়

ভারতীয় শেয়ার বাজারের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, বড় পতনের পরেই দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্ন এসেছে। ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দা, ২০২০ সালের অতিমারী পরবর্তী সময় এই দুটোই বড় উদাহরণ।

যাঁরা ওই সময় ভয় পেয়ে বাজার ছেড়ে দিয়েছিলেন, তারা সুযোগ হারিয়েছেন। আর যাঁরা ধৈর্য ধরে বিনিয়োগ চালিয়ে গিয়েছেন, তারা পরবর্তী বছরগুলোতে ভালো লাভ করেছেন।

বাজার পড়া মানে সব কোম্পানি খারাপ হয়ে গেছে, এমন নয়। অনেক সময় ভালো কোম্পানির শেয়ারও সাময়িকভাবে সস্তা হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটিই বিনিয়োগের সুযোগ।

বাজার খুব চড়া থাকলে বিনিয়োগ করবেন কি না

এই প্রশ্নটিও খুব সাধারণ। বাজার যখন রেকর্ড উচ্চতায় থাকে, তখন নতুন বিনিয়োগকারীরা দ্বিধায় পড়েন। এখন ঢুকলে যদি কালই পড়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে একসঙ্গে বড় অঙ্ক ঢোকানো ঠিক নয়। কিন্তু বিনিয়োগ একেবারে বন্ধ করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং অল্প অল্প করে বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়া উচিত।

বাজার চড়া থাকলে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল খাত বেছে নেওয়া ভালো। যেমন ব্যাঙ্কিং, বিদ্যুৎ, ভোগ্যপণ্য বা ওষুধ শিল্প। এই ধরনের কোম্পানি বাজার পড়লেও তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উৎসবের সময় বা বছরের শুরু কি বিনিয়োগের ভালো সময়

ভারতে অনেকেই মনে করেন বছরের শুরু বা উৎসবের সময় বিনিয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। বাস্তবে এই ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে মানসিকভাবে অনেক মানুষ নতুন বছরে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ নিয়ে সচেতন হন।

এই সময়ে বিনিয়োগ শুরু করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল ধারাবাহিকতা। আপনি যদি বছরের শুরুতে একটি পরিকল্পনা করেন এবং সারা বছর তা মেনে চলেন, তাহলে ফল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

নিজের আয়ের স্থায়িত্ব বুঝে বিনিয়োগের সময় ঠিক করা

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সময় নির্ভর করে আপনার আয়ের উপরও। যাঁদের চাকরি স্থায়ী, মাসিক আয় নির্দিষ্ট, তারা নিয়মিত বিনিয়োগ করতে পারেন।

কিন্তু যাঁদের আয় অনিয়মিত, যেমন ছোট ব্যবসায়ী বা ফ্রিল্যান্সার, তাদের বিনিয়োগের সময় আরও সাবধানে ঠিক করা দরকার। এই ক্ষেত্রে আগে জরুরি তহবিল তৈরি করা জরুরি। অন্তত ছয় মাসের খরচ আলাদা করে রাখার পরই শেয়ার বাজারে টাকা ঢোকানো উচিত।

নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য সেরা সময় কখন

নতুনদের জন্য শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সেরা সময় হল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, তবে অল্প অঙ্ক দিয়ে। সময়কে বাজারে দেওয়াই এখানে সবচেয়ে বড় শক্তি।

একজন যদি পঁচিশ বছর বয়সে বিনিয়োগ শুরু করেন, আর অন্যজন যদি পঁয়তাল্লিশে শুরু করেন, তাহলে একই অঙ্ক বিনিয়োগ করলেও ফল এক হবে না। সময় যত বেশি, ঝুঁকি সামাল দেওয়ার সুযোগ তত বেশি।

নতুনদের জন্য শুরুতেই সরাসরি শেয়ার না কিনে বড় মিউচুয়াল ফান্ড বা ইনডেক্স ফান্ডে বিনিয়োগ করা নিরাপদ।

খবর দেখে বিনিয়োগের সময় ঠিক করবেন না

নিউজ চ্যানেল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন নানা ভবিষ্যদ্বাণী শোনা যায়। আজ বাজার পড়বে, কাল বাড়বে। বাস্তবে এই ধরনের খবরের উপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করা বিপজ্জনক।

শেয়ার বাজার অনেক সময় খবরের আগেই সবকিছু হিসাব করে ফেলে। আপনি যখন খবর শুনে সিদ্ধান্ত নেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।

বরং কোম্পানির ব্যবসা, আয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক।

রাজনৈতিক ঘটনা ও নির্বাচনের সময় বিনিয়োগ

ভারতে নির্বাচন বা বড় রাজনৈতিক ঘটনার সময় বাজারে অস্থিরতা দেখা যায়। অনেকেই এই সময় বিনিয়োগ বন্ধ করে দেন। কিন্তু অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা জানেন, এই অস্থিরতাই অনেক সময় সুযোগ তৈরি করে।

তবে এই সময়ে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বরং ধীরে ধীরে বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে। কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে গেলে বাজার আবার স্বাভাবিক হয়।

করের বিষয় মাথায় রেখে সময় নির্ধারণ

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সময় করের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এক বছরের কম সময়ে শেয়ার বিক্রি করলে কর বেশি দিতে হয়। এক বছরের বেশি রাখলে করের চাপ তুলনামূলক কম।

তাই শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য সময় বেছে নেওয়া অনেক সময় লাভজনক হয় না। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করলে করের সুবিধাও পাওয়া যায়।

লোকাল উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক

কলকাতার এক স্কুল শিক্ষক প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা বিনিয়োগ শুরু করেছিলেন দশ বছর আগে। বাজার পড়া বা ওঠা নিয়ে তিনি খুব একটা চিন্তা করেননি। শুধু নিয়মিত বিনিয়োগ চালিয়ে গিয়েছেন। আজ তার বিনিয়োগের মূল্য প্রায় তিন গুণ।

অন্যদিকে এক পরিচিত ব্যবসায়ী বন্ধু বাজার পড়েছে শুনে একবারে বড় অঙ্ক ঢুকিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর বাজার আরও পড়ায় তিনি আতঙ্কে সব বিক্রি করে দেন। ফলে ক্ষতি হয়।

এই দুই উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়, বিনিয়োগের সময়ের চেয়ে ধারাবাহিকতা ও ধৈর্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সময় বলে নির্দিষ্ট কোনও দিন বা মাস নেই। সঠিক সময় হল যখন আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত, আর্থিকভাবে স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদে থাকতে রাজি।

বাজার পড়লে ভয় নয়, সুযোগ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করাই সফল বিনিয়োগকারীর পরিচয়। সময়কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে, সময়কে আপনার পক্ষে কাজে লাগান। তবেই শেয়ার বাজার আপনার আর্থিক জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন

Know more: সেরা ১১টি আইপিও তালিকা যেগুলি বিনিয়োগকারীদের নজরে

Know more: এই কয়েকটি মিড ক্যাপ স্টকে রয়েছে বিয়াল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনা

1 thought on “শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সঠিক সময় কখন জানা জরুরি বিষয়গুলো”

Leave a Comment