শেয়ার বাজারে নতুন যারা পা রাখেন, তাঁদের অনেকের মনেই প্রথম যে প্রশ্নটি আসে তা হল ইক্যুইটি শেয়ার আর সাধারণ শেয়ার কি আলাদা কিছু, নাকি দুটো একই। অনেক সময় সংবাদমাধ্যম, টিভি ডিবেট বা ইউটিউব ভিডিওতে এই শব্দ দুটি এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যেন আলাদা কোনও জটিল বিষয়। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
আসলে শেয়ার বাজারের ভাষা যতটা কঠিন মনে হয়, বাস্তবে বিষয়টা ততটা জটিল নয়। সঠিকভাবে বোঝালে ইক্যুইটি শেয়ার ও সাধারণ শেয়ারের ধারণা খুব সহজ। এই লেখায় ধাপে ধাপে বোঝানো হবে এই দুই শব্দের প্রকৃত অর্থ, তাদের মধ্যে সম্পর্ক, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেন এগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং ভারতীয় প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের জন্য এর বাস্তব প্রভাব কী।
শেয়ার বলতে ঠিক কী বোঝায়
একটি সংস্থা যখন ব্যবসা চালানোর জন্য বড় অঙ্কের টাকা প্রয়োজন হয়, তখন তারা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও টাকা তোলে। সেই টাকা তোলার একটি উপায় হল শেয়ার ইস্যু করা।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, শেয়ার মানে কোনও কোম্পানির মালিকানার একটি অংশ। আপনি যদি কোনও সংস্থার শেয়ার কেনেন, তাহলে আপনি সেই সংস্থার আংশিক মালিক হয়ে যান।
ধরা যাক, একটি ভারতীয় কোম্পানির মোট মালিকানা একশো ভাগ। সেই মালিকানাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে শেয়ার হিসেবে বাজারে ছাড়া হয়। আপনি যত শেয়ার কিনবেন, ততটুকু অংশের মালিক হবেন।
সাধারণ শেয়ার কী
সাধারণ শেয়ার হল কোম্পানির সেই শেয়ার, যা বেশিরভাগ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কেনেন। এই শেয়ার কেনার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কোম্পানির মালিকানার অংশীদার হন এবং কিছু নির্দিষ্ট অধিকার পান।
সাধারণ শেয়ার ধারকরা সাধারণত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেয়ে থাকেন।
প্রথমত, ভোট দেওয়ার অধিকার। কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় সাধারণ শেয়ারধারীরা ভোট দিতে পারেন। বোর্ড অফ ডিরেক্টর নির্বাচন, বড় সিদ্ধান্ত অনুমোদন ইত্যাদিতে এই ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয়ত, লভ্যাংশ পাওয়ার অধিকার। কোম্পানি লাভ করলে পরিচালন পর্ষদ সিদ্ধান্ত নেয় লভ্যাংশ দেওয়া হবে কি না। সাধারণ শেয়ারধারীরা সেই লভ্যাংশ পান, যদিও এর কোনও নিশ্চয়তা নেই।
তৃতীয়ত, মূলধন বৃদ্ধির সুযোগ। কোম্পানির ব্যবসা বাড়লে শেয়ারের দাম বাড়তে পারে। তখন শেয়ার বিক্রি করে লাভ করা যায়।
ভারতের অধিকাংশ পরিচিত শেয়ার, যেমন রিলায়েন্স, টাটা স্টিল, এসবিআই, ইনফোসিস, এগুলো সবই সাধারণ শেয়ারের উদাহরণ।
ইক্যুইটি শেয়ার কী
এখন প্রশ্ন আসে, ইক্যুইটি শেয়ার কী তবে। বাস্তবে ভারতীয় শেয়ার বাজারে সাধারণ শেয়ার এবং ইক্যুইটি শেয়ার বলতে প্রায় একই জিনিস বোঝানো হয়।
ইক্যুইটি শব্দটির অর্থ হল মালিকানা। ইক্যুইটি শেয়ার মানে সেই শেয়ার, যা কোম্পানির ইক্যুইটি ক্যাপিটালের প্রতিনিধিত্ব করে। অর্থাৎ যে শেয়ারের মাধ্যমে আপনি কোম্পানির মালিকানার অংশ পান, সেটাই ইক্যুইটি শেয়ার।
সাধারণ ভাষায় বললে, ভারতে সাধারণ শেয়ারকেই ইক্যুইটি শেয়ার বলা হয়। এই কারণেই এই দুটি শব্দ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
তাহলে পার্থক্য কোথায়
অনেকেই ভাবেন সাধারণ শেয়ার আর ইক্যুইটি শেয়ার আলাদা। কিন্তু বাস্তবে ভারতীয় বাজারে এই দুই শব্দ একই অর্থে ব্যবহার হয়।
তবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বই বা কিছু বিদেশি প্রেক্ষাপটে সাধারণ শেয়ার শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয়, আর ইক্যুইটি শেয়ার শব্দটি বেশি ব্যবহার হয় ফাইন্যান্স ও হিসাববিজ্ঞানের ভাষায়।
ভারতের স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত যে শেয়ারগুলি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কেনাবেচা করেন, সেগুলো মূলত ইক্যুইটি শেয়ার বা সাধারণ শেয়ার।
ইক্যুইটি শেয়ারের বৈশিষ্ট্য
ইক্যুইটি শেয়ারের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা বিনিয়োগের আগে জানা খুব জরুরি।
এই শেয়ারের উপর নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশের নিশ্চয়তা নেই। কোম্পানি লাভ করলেও লভ্যাংশ নাও দিতে পারে।
কোম্পানি লোকসান করলে ইক্যুইটি শেয়ারের দাম কমতে পারে। তাই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
তবে দীর্ঘমেয়াদে ইক্যুইটি শেয়ারই সবচেয়ে বেশি সম্পদ তৈরি করে, এমন উদাহরণ ভারতের বাজারে অসংখ্য।
ভারতীয় মধ্যবিত্ত ও ইক্যুইটি শেয়ার
এক সময় ভারতের মধ্যবিত্ত পরিবারে শেয়ার বাজার নিয়ে ভয় কাজ করত। মানুষ ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট বা সোনাতেই বেশি ভরসা রাখত।
কিন্তু গত দশ থেকে পনেরো বছরে এই ধারণা অনেকটাই বদলেছে। ডিজিটাল ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট, মোবাইল অ্যাপ, সহজ কেওয়াইসি প্রক্রিয়ার ফলে এখন ছোট শহর ও গ্রাম থেকেও মানুষ ইক্যুইটি শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন।
একজন স্কুল শিক্ষক, ছোট দোকানদার বা চাকুরিজীবী মাসে অল্প অল্প টাকা দিয়ে ভালো কোম্পানির ইক্যুইটি শেয়ার কিনে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল পাচ্ছেন।
ইক্যুইটি শেয়ার বনাম প্রেফারেন্স শেয়ার
এই প্রসঙ্গে আরেকটি শব্দ প্রায়ই শোনা যায়, সেটি হল প্রেফারেন্স শেয়ার। অনেকেই ইক্যুইটি শেয়ারকে এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন।
প্রেফারেন্স শেয়ারধারীরা নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ পান, কিন্তু সাধারণত তাঁদের ভোট দেওয়ার অধিকার থাকে না।
ইক্যুইটি বা সাধারণ শেয়ারধারীদের লভ্যাংশ নির্দিষ্ট নয়, কিন্তু ভোটাধিকার থাকে।
ভারতের শেয়ার বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ইক্যুইটি শেয়ারই বেশি জনপ্রিয়।
ঝুঁকি ও দায়িত্ব
ইক্যুইটি শেয়ার মানেই ঝুঁকি। বাজার পড়লে শেয়ারের দাম কমবে, সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু এই ঝুঁকির সঙ্গেই বড় লাভের সম্ভাবনাও থাকে। তাই ইক্যুইটি শেয়ারে বিনিয়োগ মানে শুধু টাকা লাগানো নয়, দায়িত্ব নিয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া।
সংস্থার ব্যবসা, আয়, ঋণের পরিমাণ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বোঝা খুব জরুরি।
কেন ইক্যুইটি শেয়ারকে দীর্ঘমেয়াদে ভালো বলা হয়
ভারতের শেয়ার বাজারের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, ভালো কোম্পানির ইক্যুইটি শেয়ার দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতিকে হার মানিয়েছে।
এক সময় যে শেয়ারের দাম কয়েক টাকা ছিল, আজ তা কয়েকশো বা কয়েক হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
এই সম্পদ সৃষ্টির ক্ষমতার কারণেই ইক্যুইটি শেয়ারকে অনেকেই ধৈর্যের পরীক্ষা বলেন।
নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য বাস্তব পরামর্শ
ইক্যুইটি শেয়ার বা সাধারণ শেয়ার বোঝার পরেও হঠাৎ বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করা উচিত নয়।
ছোট অঙ্ক দিয়ে শুরু করা, নিয়মিত শেখা, বাজারের ওঠানামা দেখে আতঙ্কিত না হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ভারতের বহু সফল বিনিয়োগকারী একথাই বলেছেন, সময়ই ইক্যুইটি শেয়ারের সবচেয়ে বড় বন্ধু।
শেষ কথা
ইক্যুইটি শেয়ার এবং সাধারণ শেয়ার নিয়ে যে ভয় বা বিভ্রান্তি রয়েছে, তা মূলত তথ্যের অভাব থেকেই আসে।
আসলে এই দুই শব্দ একই অর্থ বহন করে এবং দুটোই একজন সাধারণ মানুষের জন্য কোম্পানির মালিকানায় অংশ নেওয়ার পথ।
শেয়ার বাজারে সফল হওয়ার জন্য বড় বড় শব্দ নয়, প্রয়োজন ধৈর্য, বোঝাপড়া এবং বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি।
ইক্যুইটি শেয়ার কোনও জুয়ার টিকিট নয়, আবার কোনও যাদুও নয়। এটি একটি আর্থিক হাতিয়ার, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ভবিষ্যৎকে অনেকটা নিরাপদ করা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
Know more: ২০২৬ শেয়ার বাজার: ভারতের বাজার কোন পথে যাবে, বিনিয়োগকারীদের জন্য কী সুযোগ ও ঝুঁকি
Know more: শেয়ার বাজারে সর্বনিম্ন কত টাকা বিনিয়োগ করা যায়? নতুনদের জন্য সম্পূর্ণ গাইড

আমি Samapti Sarkar। ব্যক্তিগত ফিনান্স, স্টক মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড ও স্মার্ট সেভিংস নিয়ে লেখালেখি করি। গত কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ সম্পর্কিত পড়াশোনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখা তথ্য পাঠকদের জন্য সহজ ভাষায় তুলে ধরছি। এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিটি কনটেন্ট প্রস্তুত করা হয় গবেষণা, ডেটা ও নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করে। পাঠকদের আর্থিক জ্ঞান বৃদ্ধি ও সঠিক তথ্য দেওয়াই আমার লক্ষ্য।
1 thought on “ইক্যুইটি শেয়ার এবং সাধারণ শেয়ার কি? বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ভাষায় সম্পূর্ণ গাইড”