গোল্ডের বিনিময়ে ব্যাঙ্ক থেকে কিভাবে লোন পাওয়া যায়? গোল্ড লোন নেওয়ার সম্পূর্ণ গাইড

প্রয়োজনে সোনাই ভরসা কেন করেন ভারতীয়রা

ভারতীয় সমাজে সোনা শুধু গয়না নয়, এটি বহু প্রজন্ম ধরে সঞ্চয়ের এক নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। বিপদের দিনে ব্যাঙ্ক ব্যালান্স ফুরিয়ে গেলেও আলমারির কোণে রাখা গয়না অনেক সময় পরিবারকে বাঁচিয়েছে। চিকিৎসা, ব্যবসা, সন্তানের পড়াশোনা বা হঠাৎ বড় খরচের সময় অনেকেই প্রশ্ন করেন, সোনা বন্ধক রেখে ব্যাঙ্ক থেকে লোন কীভাবে পাওয়া যায়।

আজকের এই প্রতিবেদনে সহজ ভাষায় জানানো হল, গোল্ড লোন কী, ব্যাঙ্ক কীভাবে সোনার বিনিময়ে টাকা দেয়, কোন কোন কাগজপত্র লাগে, সুদের হার কেমন হয় এবং এই লোন নেওয়ার আগে কী বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।

গোল্ড লোন আসলে কী

গোল্ড লোন হল এমন একটি ঋণ, যেখানে আপনি নিজের সোনার গয়না ব্যাঙ্কের কাছে বন্ধক রাখেন এবং তার বদলে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা লোন হিসেবে পান। লোন শোধ হয়ে গেলে ব্যাঙ্ক সেই সোনা আপনাকে ফেরত দেয়।

এখানে সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, আয় কম হলেও বা ক্রেডিট স্কোর খুব ভালো না হলেও লোন পাওয়া যায়। কারণ ব্যাঙ্কের কাছে নিরাপত্তা হিসেবে থাকে আপনার সোনা।

কেন ব্যাঙ্ক গোল্ড লোন দিতে আগ্রহী

ব্যাঙ্কের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সোনা একটি নিরাপদ সম্পদ। সোনার বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং প্রয়োজন হলে সহজেই বিক্রি করা যায়। তাই ব্যক্তিগত লোন বা ব্যবসায়িক লোনের তুলনায় গোল্ড লোনে ব্যাঙ্কের ঝুঁকি কম।

এই কারণেই অনেক সময় গোল্ড লোনের সুদের হার অন্য লোনের তুলনায় কম হয় এবং অনুমোদনও দ্রুত মেলে।

কোন ধরনের সোনা বন্ধক রাখা যায়

সব ধরনের সোনা ব্যাঙ্ক গ্রহণ করে না। সাধারণত ব্যাঙ্ক যে সোনা নেয়, সেগুলি হল
বিয়ের গয়না যেমন হার, চুড়ি, কানের দুল, আংটি
খাঁটি সোনার চেন বা লকেট

সাধারণত কয়েন, বার বা খুব বেশি আধুনিক ডিজাইনের গয়না সব ব্যাঙ্ক নেয় না। আবার সোনার মধ্যে যদি পাথর বা অন্য ধাতু বেশি থাকে, তাহলে তার মূল্য কম ধরা হয়।

সোনার বিশুদ্ধতা কীভাবে যাচাই হয়

ব্যাঙ্কে পৌঁছানোর পর প্রথম ধাপ হল সোনার বিশুদ্ধতা পরীক্ষা। ব্যাঙ্কের প্রশিক্ষিত কর্মীরা বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে সোনার ক্যারেট নির্ধারণ করেন। সাধারণত বাইশ ক্যারেট বা তার কাছাকাছি সোনার উপরই সবচেয়ে ভালো মূল্য পাওয়া যায়।

এই পরীক্ষার সময় আবেদনকারীর সামনেই সোনা যাচাই করা হয়, যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।

সোনার দামের উপর লোনের অঙ্ক কীভাবে ঠিক হয়

ব্যাঙ্ক কখনওই সোনার পুরো বাজারমূল্যের সমান টাকা লোন দেয় না। সাধারণত সোনার মোট মূল্যের পঁচাত্তর শতাংশ পর্যন্ত লোন দেওয়া হয়।

ধরা যাক, আপনার কাছে থাকা সোনার বর্তমান বাজারমূল্য চার লক্ষ টাকা। সেক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক সর্বোচ্চ তিন লক্ষ টাকার কাছাকাছি লোন দিতে পারে।

এই সীমা রাখা হয় যাতে সোনার দামে হঠাৎ ওঠানামা হলেও ব্যাঙ্কের ক্ষতি না হয়।

গোল্ড লোন পেতে কী কী কাগজপত্র লাগে

গোল্ড লোনের বড় সুবিধা হল, এখানে কাগজপত্র খুব বেশি লাগে না। সাধারণত যা লাগে
পরিচয়পত্র যেমন আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড
ঠিকানার প্রমাণ
দুটি পাসপোর্ট সাইজ ছবি

অনেক ক্ষেত্রে আয় প্রমাণ বা আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয় না। তবে ব্যাঙ্ক ভেদে নিয়ম আলাদা হতে পারে।

লোনের মেয়াদ কতদিন হয়

গোল্ড লোন সাধারণত স্বল্পমেয়াদি হয়। মেয়াদ ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত হতে পারে। কেউ কেউ এই লোন খুব স্বল্প সময়ের জন্য নেন, আবার কেউ এক বছর বা তার বেশি সময়ের জন্যও নেন।

মেয়াদ যত কম হবে, সুদের বোঝাও সাধারণত তত কম হয়।

সুদের হার কীভাবে নির্ধারিত হয়

গোল্ড লোনের সুদের হার অনেকটাই নির্ভর করে ব্যাঙ্ক, লোনের মেয়াদ এবং লোনের অঙ্কের উপর। সাধারণত এই সুদের হার ব্যক্তিগত লোনের চেয়ে কম হয়।

কিছু ব্যাঙ্কে নিয়মিত সুদ দেওয়া আর কিছু ব্যাঙ্কে মেয়াদ শেষে একসঙ্গে সুদ ও আসল শোধ করার সুবিধা থাকে।

কিস্তিতে শোধ না একসঙ্গে শোধ

গোল্ড লোনে শোধের পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে নমনীয়। কেউ চাইলে প্রতি মাসে শুধু সুদ দিতে পারেন এবং শেষে আসল টাকা শোধ করতে পারেন। আবার কেউ চাইলে নির্দিষ্ট কিস্তিতে পুরো টাকা শোধ করতে পারেন।

গ্রাম বা ছোট শহরের অনেক ব্যবসায়ী মৌসুমি আয়ের উপর নির্ভর করেন। তাঁদের জন্য এই নমনীয়তা বিশেষভাবে উপকারী।

সময়মতো লোন শোধ না হলে কী হয়

যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লোন শোধ না করা হয়, তাহলে ব্যাঙ্ক প্রথমে নোটিস পাঠায়। তারপরও টাকা শোধ না হলে ব্যাঙ্ক আইন অনুযায়ী বন্ধক রাখা সোনা নিলামে তুলতে পারে।

এই কারণে গোল্ড লোন নেওয়ার সময় মেয়াদ এবং শোধের পরিকল্পনা পরিষ্কার রাখা খুব জরুরি।

ব্যাঙ্ক আর অন্য প্রতিষ্ঠানের গোল্ড লোনে পার্থক্য

অনেক বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানও গোল্ড লোন দেয়। তবে ব্যাঙ্কের তুলনায় সেখানে সুদের হার বেশি হতে পারে। ব্যাঙ্কে নিরাপত্তা এবং নিয়মকানুন তুলনামূলকভাবে কঠোর হলেও স্বচ্ছতা বেশি থাকে।

প্রথমবার গোল্ড লোন নিলে ব্যাঙ্ক থেকেই নেওয়া অনেক সময় বেশি নিরাপদ।

কারা গোল্ড লোন নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন

হঠাৎ চিকিৎসার খরচ
ছোট ব্যবসার পুঁজি
সন্তানের পড়াশোনা
চাষের কাজে অস্থায়ী অর্থের প্রয়োজন

এই ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে গোল্ড লোন একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।

গোল্ড লোন নেওয়ার আগে কী ভাববেন

লোন নেওয়ার আগে নিজের শোধ করার ক্ষমতা ভালো করে হিসাব করা জরুরি। সোনা আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তাই ঝুঁকি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

সুদের হার, প্রসেসিং ফি, নিলামের শর্ত সব কিছু ভালো করে পড়ে নেওয়া উচিত।

শেষ কথা

গোল্ড লোন ভারতীয় আর্থিক ব্যবস্থায় বহুদিনের পরিচিত একটি ব্যবস্থা। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি আর্থিক সংকটে বড় ভরসা হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি শেষ পর্যন্ত ঋণই। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী এবং পরিকল্পনা করে গোল্ড লোন নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সঠিক তথ্য ও সচেতন সিদ্ধান্তই পারে আপনার সঞ্চিত সোনাকে নিরাপদ রেখে আর্থিক সমস্যার সমাধান করতে।

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন

Know more: সেরা ১১টি আইপিও তালিকা যেগুলি বিনিয়োগকারীদের নজরে

Know more: এই কয়েকটি মিড ক্যাপ স্টকে রয়েছে বিয়াল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনা