শেয়ার বাজার মানেই অনিশ্চয়তা। কখনও হঠাৎ উত্থান, কখনও আচমকা পতন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু সংস্থা নিজেদের শক্ত ভিত তৈরি করে নেয়। দৈনিক ওঠানামার বাইরে গিয়ে যদি কেউ শেষ পাঁচ বছরের দিকে তাকান, তাহলে পরিষ্কার বোঝা যায় কোন কোন শেয়ার সত্যিই বিনিয়োগকারীদের ধৈর্যের ফল দিয়েছে।
ভারতের শেয়ার বাজার গত পাঁচ বছরে একাধিক বড় ঘটনার সাক্ষী। কোভিড অতিমারি, লকডাউন, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া, তার পর ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ডিজিটাল বিপ্লব, মেক ইন ইন্ডিয়া, প্রতিরক্ষা খাতে সরকারি জোর, ব্যাঙ্কিং সেক্টরের ঘুরে দাঁড়ানো। এই সব কিছুর প্রভাব সরাসরি পড়েছে শেয়ার বাজারে।
এই লেখায় আমরা কোনও টিপস দেব না, কাউকে শেয়ার কিনতে বা বিক্রি করতে বলব না। বরং শেষ পাঁচ বছরে যে সব শেয়ার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই সংস্থাগুলোর পেছনের গল্প, ব্যবসার ধরন এবং কেন তারা এগিয়ে গেল তা বিশ্লেষণ করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কেন গুরুত্বপূর্ণ
অনেকেই শেয়ার বাজারে ঢুকে দ্রুত লাভের আশায় থাকেন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, শর্ট টার্ম ট্রেডিংয়ে ঝুঁকি অনেক বেশি। বিপরীতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ভালো সংস্থার সঙ্গে ধৈর্য ধরে থাকলে ফল পাওয়া যায়।
গত পাঁচ বছরের পারফরম্যান্স দেখলে বোঝা যায়, যারা শক্ত ফান্ডামেন্টাল, পরিষ্কার ব্যবসা মডেল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকা সংস্থায় ভরসা রেখেছিলেন, তাঁদের পুঁজি ধীরে ধীরে কিন্তু স্থায়ীভাবে বেড়েছে।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ: পুরনো নাম, নতুন রূপ
ভারতীয় শেয়ার বাজারে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের নাম আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু শেষ পাঁচ বছরে এই সংস্থা শুধুমাত্র তেল ও পেট্রোকেমিক্যালের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি।
ডিজিটাল ব্যবসা, টেলিকম, খুচরো বাজারে আগ্রাসী বিস্তার রিলায়েন্সকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জিও প্ল্যাটফর্মস চালু হওয়ার পর গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র ইন্টারনেট ব্যবহারে বিপ্লব এসেছে। একই সঙ্গে রিলায়েন্স রিটেল ছোট দোকানদারদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করেছে।
এই বহুমুখী বিস্তারই গত পাঁচ বছরে রিলায়েন্স শেয়ারের ধারাবাহিক বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
টাটা এলএক্সআই: প্রযুক্তির শক্তিতে উত্থান
এক সময় টাটা গ্রুপের এই সংস্থার নাম অনেকের কাছেই অচেনা ছিল। কিন্তু ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়ারিং, অটোমোবাইল সফটওয়্যার, মেডিক্যাল টেকনোলজি এবং মিডিয়া প্রযুক্তিতে কাজ করে টাটা এলএক্সআই নিজেকে অনন্য জায়গায় নিয়ে গেছে।
বিশ্ব জুড়ে যখন ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন শুরু হয়, তখন এই সংস্থার পরিষেবার চাহিদা হু হু করে বাড়ে। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে বড় বড় প্রকল্প আসতে শুরু করে।
শেষ পাঁচ বছরে টাটা এলএক্সআই শেয়ার বহু বিনিয়োগকারীর জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে।
এশিয়ান পেইন্টস: ঘর সাজানোর বাজারের রাজা
ভারতে বাড়ি মানেই রঙ। শহর হোক বা গ্রাম, নতুন বাড়ি বা পুরনো বাড়ির সংস্কার সব জায়গাতেই এশিয়ান পেইন্টসের উপস্থিতি।
এই সংস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের ব্র্যান্ড বিশ্বাস এবং শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক। ছোট শহর, মফস্বল এমনকি গ্রামাঞ্চলেও এশিয়ান পেইন্টস সহজে পাওয়া যায়।
কোভিড পরবর্তী সময়ে যখন মানুষ ঘর সাজানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, তখন এই সংস্থার ব্যবসা আরও চাঙ্গা হয়। শেষ পাঁচ বছরে শেয়ারের বৃদ্ধি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
বাজাজ ফাইন্যান্স: সাধারণ মানুষের ঋণের গল্প
এক সময় ব্যাঙ্ক ঋণ পেতে গেলে ছিল লম্বা লাইনের ঝামেলা, কাগজপত্রের পাহাড়। বাজাজ ফাইন্যান্স সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।
মোবাইল ফোন, টিভি, ফ্রিজ, বাইক থেকে শুরু করে পার্সোনাল লোন সব কিছুই সহজ কিস্তিতে দেওয়ার মাধ্যমে তারা কোটি কোটি গ্রাহকের কাছে পৌঁছে গেছে।
ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাজাজ ফাইন্যান্সকে গত পাঁচ বছরে শেয়ার বাজারের অন্যতম সফল গল্প বানিয়েছে।
লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো: পরিকাঠামোর ভরসার নাম
ভারতের উন্নয়ন মানেই রাস্তা, সেতু, মেট্রো, বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই সব জায়গাতেই এলঅ্যান্ডটির উপস্থিতি।
সরকারি ও বেসরকারি পরিকাঠামো প্রকল্পে ধারাবাহিক কাজ পাওয়া এই সংস্থাকে স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হলেও এলঅ্যান্ডটির অর্ডার বুক শক্ত থাকায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে।
গত পাঁচ বছরে ভারতের পরিকাঠামো উন্নয়নের জোয়ারে এলঅ্যান্ডটির শেয়ারও উপকৃত হয়েছে।
সান ফার্মাসিউটিক্যালস: ওষুধের জোরে স্থিতিশীল বৃদ্ধি
কোভিড অতিমারির সময় গোটা বিশ্ব বুঝেছে ওষুধ শিল্পের গুরুত্ব। সান ফার্মা ভারতের অন্যতম বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা হিসেবে সেই সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
দেশের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও জেনেরিক ও স্পেশালিটি ওষুধ রপ্তানি করে এই সংস্থা। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ তাদের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি।
শেষ পাঁচ বছরে সান ফার্মার শেয়ার ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে এগিয়েছে।
আদানি পোর্টস: বন্দর ব্যবসার উত্থান
ভারতের বাণিজ্য মানেই আমদানি ও রপ্তানি। আর সেই বাণিজ্যের বড় অংশই সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে হয়।
আদানি পোর্টস ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের পরিচালনা করে। লজিস্টিকস, স্টোরেজ এবং পরিবহন পরিষেবা যুক্ত হওয়ায় তাদের আয় বহুমুখী হয়েছে।
যদিও মাঝেমধ্যে বিতর্ক এসেছে, তবুও শেষ পাঁচ বছরে ব্যবসার বিস্তার শেয়ারের বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে।
ইচারের মোটরস: রয়্যাল এনফিল্ডের পুনর্জাগরণ
এক সময় রয়্যাল এনফিল্ড মানেই ছিল সীমিত গ্রাহক। কিন্তু নতুন ডিজাইন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং তরুণদের লক্ষ্য করে বিপণনের ফলে এই ব্র্যান্ড আবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ইচারের মোটরসের শেয়ার মূলত রয়্যাল এনফিল্ডের সাফল্যের উপর দাঁড়িয়ে। দেশের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও এই বাইকের চাহিদা বাড়ছে।
শেষ পাঁচ বছরে এই পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের চোখে পড়ার মতো রিটার্ন দিয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির ভূমিকা
শেষ পাঁচ বছরে ভারতের আইটি সংস্থাগুলিও বড় ভূমিকা পালন করেছে। ডিজিটাল পরিষেবা, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার সিকিউরিটির চাহিদা বাড়ায় একাধিক আইটি শেয়ার ভালো পারফর্ম করেছে।
বিশেষ করে যখন বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা খরচ কমাতে ভারতীয় আইটি পরিষেবার উপর ভরসা করেছে, তখন এই খাত লাভবান হয়েছে।
কেন এই শেয়ারগুলি এগিয়েছে
এই সংস্থাগুলোর মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শক্ত ব্যবসা মডেল, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ভালো ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের চাহিদা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
শেয়ার বাজারে শুধুমাত্র নাম নয়, সংস্থার ভিতরের শক্তিই দীর্ঘমেয়াদে ফল দেয়। শেষ পাঁচ বছরের গল্প সেই কথাই প্রমাণ করে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য শিক্ষা
এই বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার। নিয়মিত খবর দেখে ভয় পেয়ে শেয়ার বিক্রি করলে বড় সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে। আবার অন্ধভাবে কোনও শেয়ার কিনলেও বিপদ হতে পারে।
সংস্থার ব্যবসা বোঝা, আর্থিক ফলাফল দেখা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি রাখা সবচেয়ে জরুরি।
শেষ কথা
শেষ পাঁচ বছরে যেসব শেয়ার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তারা হঠাৎ করে বড় হয়নি। তাদের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া পরিকল্পনা, পরিশ্রম এবং বাজার বোঝার ক্ষমতা।
আজ যারা শেয়ার বাজারে নতুন, তাঁদের জন্য এই গল্পগুলো শুধুই অতীত নয়, ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা। সময়ই শেষ কথা বলে দেয় কে টিকে থাকবে, আর কে হারিয়ে যাবে।
শেয়ার বাজারে ধৈর্যই সবচেয়ে বড় পুঁজি।
গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
Know more: NSE BSE কী তাদের কী কাজ ভারতে স্টক মার্কেট কীভাবে কাজ করে
Know more: শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সঠিক সময় কখন জানা জরুরি বিষয়গুলো

আমি Samapti Sarkar। ব্যক্তিগত ফিনান্স, স্টক মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড ও স্মার্ট সেভিংস নিয়ে লেখালেখি করি। গত কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ সম্পর্কিত পড়াশোনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখা তথ্য পাঠকদের জন্য সহজ ভাষায় তুলে ধরছি। এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিটি কনটেন্ট প্রস্তুত করা হয় গবেষণা, ডেটা ও নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করে। পাঠকদের আর্থিক জ্ঞান বৃদ্ধি ও সঠিক তথ্য দেওয়াই আমার লক্ষ্য।
1 thought on “লাস্ট ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাওয়া শেয়ারগুলি কোনগুলো? দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ”