NSE BSE কী তাদের কী কাজ ভারতে স্টক মার্কেট কীভাবে কাজ করে

শেয়ার বাজার শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে ভয় তৈরি হয়। কেউ ভাবেন এটা বড়লোকদের খেলা, কেউ মনে করেন এখানে টাকা ঢোকালেই সব শেষ। কিন্তু বাস্তবটা অনেকটাই আলাদা। ভারতের স্টক মার্কেট আজ সাধারণ মানুষের আর্থিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ব্যাঙ্কে টাকা রাখার পাশাপাশি এখন বহু মানুষ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় গড়ে তুলছেন।

এই স্টক মার্কেটের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নাম nse এবং bse। এই দুটি সংস্থা ছাড়া ভারতের শেয়ার বাজার কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু আসলে nse bse কী, তাদের কাজই বা কী, আর গোটা স্টক মার্কেট ব্যবস্থাটা কীভাবে চলে, সেটাই অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়। আজ সেই বিষয়টাই সহজ ভাষায়, বাস্তব উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হলো।

স্টক মার্কেট বলতে আসলে কী বোঝায়

স্টক মার্কেট হলো এমন একটি জায়গা যেখানে বিভিন্ন কোম্পানির মালিকানার অংশ অর্থাৎ শেয়ার কেনাবেচা হয়। একটি কোম্পানি যখন ব্যবসা বাড়াতে চায়, তখন সে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে। বদলে সেই মানুষদের কোম্পানির অংশীদার করে তোলে। এই অংশীদারির নামই শেয়ার।

যিনি শেয়ার কেনেন, তিনি সেই কোম্পানির ক্ষুদ্র মালিক। কোম্পানি লাভ করলে তিনি লাভের অংশ পান, আবার ক্ষতি হলে তার বিনিয়োগের মূল্য কমে যেতে পারে।

ভারতে এই শেয়ার কেনাবেচার জন্য নির্দিষ্ট দুটি প্রধান বাজার রয়েছে। সেগুলো হলো বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ।

bse কী এবং এর কাজ কী

bse বা বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ হলো ভারতের সবচেয়ে পুরনো স্টক এক্সচেঞ্জ। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ দিকে, মুম্বই শহরে। সেই সময়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে শেয়ার কেনাবেচা করতেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় bse।

আজ bse একটি আধুনিক আর নিয়ন্ত্রিত শেয়ার বাজার। এখানে হাজার হাজার কোম্পানির শেয়ার তালিকাভুক্ত রয়েছে। ভারতের বহু বড় কোম্পানি যেমন ব্যাঙ্ক, শিল্প সংস্থা, ওষুধ কোম্পানি bse তে নথিভুক্ত।

bse এর অন্যতম পরিচিত সূচক হলো সেনসেক্স। সেনসেক্স মূলত ত্রিশটি বড় এবং শক্তিশালী কোম্পানির শেয়ারের উপর ভিত্তি করে তৈরি একটি সূচক। সেনসেক্স বাড়লে সাধারণভাবে বোঝা যায় বাজার ভালো আছে, কমলে বোঝা যায় বাজারে চাপ রয়েছে।

bse এর কাজ শুধু শেয়ার কেনাবেচার জায়গা দেওয়া নয়। এখানে লেনদেন যেন স্বচ্ছ ও নিয়ম মেনে হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হয়। বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষা করা bse এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

nse কী এবং এর ভূমিকা

nse বা ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও আজ এটি ভারতের সবচেয়ে বড় স্টক এক্সচেঞ্জ। নব্বইয়ের দশকে nse এর যাত্রা শুরু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত এবং স্বচ্ছ শেয়ার বাজার তৈরি করা।

nse প্রথম ভারতে পুরোপুরি কম্পিউটারাইজড ট্রেডিং চালু করে। এর ফলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে শেয়ার কেনাবেচা সম্ভব হয়।

nse এর সবচেয়ে পরিচিত সূচক হলো নিফটি। নিফটি মূলত পঞ্চাশটি বড় কোম্পানির শেয়ারের উপর ভিত্তি করে তৈরি। নিফটি ওঠানামা করলে বিনিয়োগকারীরা বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন।

আজ ভারতের বেশিরভাগ শেয়ার লেনদেন nse এর মাধ্যমে হয়। গ্রাম থেকে শহর, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মানুষ nse তে শেয়ার কেনাবেচা করছেন।

nse এবং bse এর মধ্যে পার্থক্য

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে, nse আর bse আলাদা কেন। আসলে দুটোই শেয়ার বাজার, কিন্তু পরিচালনা পদ্ধতি এবং ইতিহাসে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

bse পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী। nse প্রযুক্তিতে এগিয়ে। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য বড় পার্থক্য খুব একটা নেই। আজকাল প্রায় সব বড় কোম্পানির শেয়ার দুই জায়গাতেই পাওয়া যায়।

শেয়ারের দাম সাধারণত nse এবং bse তে প্রায় একই থাকে। তাই বিনিয়োগকারীরা যেকোনো এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করেই শেয়ার বাজারে অংশ নিতে পারেন।

ভারতে স্টক মার্কেট কীভাবে কাজ করে

স্টক মার্কেট কাজ করে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম এবং কাঠামোর মাধ্যমে। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে।

প্রথম ধাপ হলো ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট। শেয়ার এখন আর কাগজে রাখা হয় না। সবকিছু ডিজিটাল আকারে থাকে। এজন্য ব্যাঙ্ক বা ব্রোকারের মাধ্যমে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়।

দ্বিতীয় ধাপ ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট। শেয়ার কেনা বা বিক্রি করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য এই অ্যাকাউন্ট লাগে।

এই দুটি অ্যাকাউন্ট যুক্ত থাকলেই একজন সাধারণ মানুষ শেয়ার বাজারে প্রবেশ করতে পারেন।

ধরা যাক, পশ্চিমবঙ্গের এক চাকরিজীবী মাসে কিছু টাকা বিনিয়োগ করতে চান। তিনি একটি ডিম্যাট ও ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট খুললেন। এরপর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার নির্দেশ দিলেন। সেই নির্দেশ nse বা bse তে পৌঁছে যায়। সেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার মিল হলে লেনদেন সম্পন্ন হয়।

কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসে কীভাবে

সব কোম্পানির শেয়ার বাজারে থাকে না। কোনো কোম্পানি যখন প্রথমবার সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করে, তাকে বলা হয় প্রাথমিক শেয়ার বিক্রি।

এই প্রক্রিয়ায় কোম্পানি বাজার নিয়ন্ত্রকের অনুমতি নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলে। বিনিয়োগকারীরা আবেদন করেন। শেয়ার বরাদ্দ হলে তা ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে।

এরপর সেই শেয়ার nse বা bse তে কেনাবেচার জন্য উন্মুক্ত হয়।

শেয়ারের দাম কেন ওঠানামা করে

শেয়ারের দাম কোনো ম্যাজিকের কারণে বদলায় না। এর পেছনে বাস্তব কারণ থাকে।

কোম্পানির লাভ বাড়লে শেয়ারের চাহিদা বাড়ে। তখন দাম বাড়ে। আবার ক্ষতির খবর এলে অনেকে শেয়ার বিক্রি করতে চান, তখন দাম কমে যায়।

এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, সুদের হার, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এসবও শেয়ার বাজারে প্রভাব ফেলে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো বড় ব্যাঙ্ক ভালো ফলাফল প্রকাশ করলে তার শেয়ারের দাম বাড়তে পারে। আবার কোনো শিল্পে সরকারের কড়া নিয়ম এলে সেই শিল্পের শেয়ার পড়ে যেতে পারে।

স্টক মার্কেট কি শুধু ধনী মানুষের জন্য

এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আজকের দিনে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ শুরু করা যায় খুব অল্প টাকা দিয়ে। অনেক কোম্পানির একটি শেয়ারের দাম কয়েকশো টাকার মধ্যেই।

এছাড়া ধীরে ধীরে নিয়মিত বিনিয়োগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষও বড় তহবিল গড়ে তুলতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ হলো ধৈর্য এবং সঠিক জ্ঞান।

স্টক মার্কেটে ঝুঁকি কতটা

স্টক মার্কেটে ঝুঁকি আছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে ঝুঁকি মানেই সর্বনাশ নয়। সঠিকভাবে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

অযথা গুজব, দ্রুত লাভের লোভ, না বুঝে বিনিয়োগ এসব ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কমে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা

ভারতের স্টক মার্কেট নিয়ন্ত্রিত হয় একটি শক্তিশালী সংস্থার মাধ্যমে। এই সংস্থা বাজারের নিয়ম তৈরি করে, ব্রোকার ও কোম্পানিগুলোর উপর নজর রাখে, বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষা করে।

এর ফলে সাধারণ মানুষ কিছুটা নিশ্চিন্তে বাজারে অংশ নিতে পারেন। যদিও শতভাগ নিরাপত্তা কোনো বাজারেই নেই।

নতুন বিনিয়োগকারীর জন্য কিছু বাস্তব পরামর্শ

শেয়ার বাজারে নামার আগে নিজের আর্থিক অবস্থা বোঝা জরুরি। ধার করে বা দৈনন্দিন খরচের টাকা দিয়ে বিনিয়োগ করা উচিত নয়।

শুরুতে কম টাকা দিয়ে অভিজ্ঞতা নেওয়া ভালো। বাজার বোঝার জন্য সময় দিন। কোনো এক দিনের ওঠানামায় আতঙ্কিত হবেন না।

সবচেয়ে বড় কথা, শেয়ার বাজারকে জুয়ার জায়গা ভাববেন না। এটি ধৈর্যের খেলা।

শেষ কথা

nse এবং bse শুধু কিছু বিল্ডিং বা নাম নয়। এগুলো ভারতের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এই দুই এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে দেশের কোম্পানিগুলো বড় হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ অংশীদার হয়ে সেই বৃদ্ধির সুফল পাচ্ছেন।

স্টক মার্কেট বোঝা মানে শুধু টাকা আয়ের পথ জানা নয়, দেশের অর্থনৈতিক গতিপথ বোঝাও বটে। সঠিক জ্ঞান, বাস্তব চিন্তা এবং ধৈর্য থাকলে শেয়ার বাজার সাধারণ মানুষের জন্যও ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্ত ভিত হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন

know more: সেরা ১১টি আইপিও তালিকা যেগুলি বিনিয়োগকারীদের নজরে

Know more: এই কয়েকটি মিড ক্যাপ স্টকে রয়েছে বিয়াল্লিশ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনা