কাজের জীবনের শুরুতে অবসর শব্দটা অনেকের কাছেই দূরের কোনও ব্যাপার বলে মনে হয়। তখন মনে হয়, এখনও তো অনেক সময় আছে, পরে ভাবা যাবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অবসরকালীন জীবনের প্রস্তুতি যত দেরিতে শুরু হয়, চাপ তত বেশি বাড়ে।
আজকের ভারতে অবসর মানে আর আগের মতো শুধুই বিশ্রাম নয়। চিকিৎসা খরচ, দৈনন্দিন ব্যয়, পরিবারের দায়িত্ব, সব মিলিয়ে অবসরকালেও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা খুব জরুরি হয়ে উঠেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের প্রবণতা বেড়েছে, সন্তানরা আলাদা শহরে বা বিদেশে থাকে। ফলে নিজের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিজের কাঁধেই নিতে হচ্ছে।
এই লেখায় অবসরকালীন সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা, কীভাবে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা করবেন, ভারতীয় বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে কোথায় টাকা রাখলে নিরাপদ ও কার্যকর হবে, সেই বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
অবসরকালীন সঞ্চয় কেন এখন এত জরুরি
আগের প্রজন্মের অনেকেই পেনশন, জমিজমা বা সন্তানদের উপর ভরসা করে অবসর কাটিয়েছেন। কিন্তু সময় বদলেছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরি ছাড়া নিয়মিত পেনশনের সুবিধা খুব কম। বেসরকারি চাকরিতে কাজ করা অধিকাংশ মানুষের অবসরকালীন আয় নির্দিষ্ট নয়।
এদিকে চিকিৎসা খরচ গত কয়েক বছরে অনেক বেড়েছে। সাধারণ অসুখেও বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়ে যায়। তাই অবসর মানেই আর্থিক চিন্তামুক্ত জীবন, এই ধারণা এখন শুধুই পরিকল্পনার উপর নির্ভরশীল।
অবসরকাল মানে ঠিক কোন সময়
অবসরকাল মানে শুধু চাকরি ছাড়ার পরের জীবন নয়। অনেকেই ষাটের পরে কাজ করতে চান না বা পারেন না। আবার কেউ কেউ পঞ্চান্নতেই কাজ ছাড়তে বাধ্য হন।
তাই অবসরকাল বলতে সাধারণভাবে পঞ্চান্ন থেকে আশি বা তারও বেশি বয়স পর্যন্ত সময়টাকে ধরা যায়। অর্থাৎ প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছরের জন্য আর্থিক ব্যবস্থা রাখতে হয়।
এই দীর্ঘ সময়ে নিয়মিত আয়ের অভাব থাকলেও খরচ কিন্তু থেমে থাকে না।
অবসরকালীন জীবনের খরচ কীভাবে হিসাব করবেন
অনেকেই সঞ্চয়ের কথা ভাবেন, কিন্তু কত টাকা দরকার তা পরিষ্কার করে ভাবেন না। এটিই সবচেয়ে বড় ভুল।
প্রথমে নিজের বর্তমান মাসিক খরচ দেখুন। ধরুন আজ আপনার সংসারের মাসিক খরচ চল্লিশ হাজার টাকা। অবসরকালে হয়তো অফিস যাওয়া নেই, কিন্তু চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ বাড়বে।
সাধারণভাবে ধরা যায়, অবসরকালে বর্তমান খরচের অন্তত সত্তর থেকে আশি শতাংশ টাকা প্রতি মাসে দরকার হবে।
এর সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির হিসাব যোগ করা জরুরি। আজ যা চল্লিশ হাজার, দশ বছর পর সেটাই হয়তো ষাট হাজার হয়ে যাবে।
যত তাড়াতাড়ি শুরু করবেন, তত সহজ হবে
অবসরকালীন সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে বড় বন্ধু। যে যত আগে শুরু করবে, তার উপর চাপ তত কম পড়বে।
একজন পঁচিশ বছর বয়সী যদি মাসে সামান্য অঙ্কও নিয়মিত সঞ্চয় করেন, তাহলে পঞ্চান্ন বছরে এসে সেই টাকাই বড় অঙ্কে দাঁড়াতে পারে।
অন্যদিকে চল্লিশের পরে শুরু করলে একই লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেক বেশি টাকা জমাতে হয়।
ভারতের মধ্যবিত্তের জন্য অবসর সঞ্চয়ের বাস্তব পথ
ভারতের মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য অবসরকালীন সঞ্চয় মানে একাধিক মাধ্যমে টাকা রাখা।
সব টাকা এক জায়গায় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ঝুঁকি এবং নিরাপত্তার ভারসাম্য রাখতে হয়।
প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং পেনশন ভিত্তিক সঞ্চয়
চাকরিজীবীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড অবসর সঞ্চয়ের একটি শক্ত ভিত্তি। চাকরির সময় নিয়মিত কাটা টাকা ভবিষ্যতে বড় সহায় হয়ে দাঁড়ায়।
যাঁরা বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন, তাঁদের জন্য এই ফান্ড অনেকটাই নির্ভরযোগ্য সঞ্চয়।
এর পাশাপাশি পেনশন ভিত্তিক প্রকল্প অবসরকালে নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করে।
মিউচুয়াল ফান্ডে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়
অনেকেই মনে করেন মিউচুয়াল ফান্ড ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফান্ড বেছে নিয়ে নিয়মিত টাকা রাখলে অবসর সঞ্চয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
ভারতে বহু চাকরিজীবী মাসিক ভিত্তিতে অল্প অল্প টাকা মিউচুয়াল ফান্ডে রেখে ভবিষ্যতের জন্য তহবিল গড়ে তুলছেন।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিয়মিত থাকা এবং বাজারের ওঠানামায় আতঙ্কিত না হওয়া।
ব্যাঙ্ক আমানত এবং নিরাপদ সঞ্চয়
অবসরকালে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। তাই নিরাপদ সঞ্চয় মাধ্যমও জরুরি।
ব্যাঙ্কের স্থায়ী আমানত, পোস্ট অফিসের সঞ্চয় প্রকল্প অনেকের কাছে এখনও ভরসার জায়গা।
যদিও এখানে লাভ তুলনামূলক কম, কিন্তু নিরাপত্তা বেশি।
সোনার ভূমিকা অবসর সঞ্চয়ে
ভারতীয় পরিবারে সোনার গুরুত্ব আলাদা। শুধু গয়না নয়, আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবেও সোনা দেখা হয়।
অবসরকালীন সঞ্চয়ে সোনা সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে মূল্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে।
তবে সব সঞ্চয় সোনায় রাখা উচিত নয়।
স্বাস্থ্য বীমা অবসর পরিকল্পনার অঙ্গ
অনেকে সঞ্চয়ের কথা ভাবেন, কিন্তু স্বাস্থ্য বীমার কথা ভুলে যান।
অবসরকালে নিয়মিত আয় না থাকলে বড় চিকিৎসা খরচ সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে।
তাই অবসর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই স্বাস্থ্য বীমা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সন্তানদের উপর পুরোপুরি নির্ভর না করাই ভালো
ভারতীয় সমাজে এখনও অনেকেই ভাবেন, সন্তানরা দেখবে। কিন্তু বাস্তবতা বদলেছে।
সন্তানদের নিজের জীবন, দায়িত্ব, খরচ রয়েছে। তাই নিজের অবসরকালীন নিরাপত্তা নিজেকেই গড়ে নিতে হবে।
এটা আত্মসম্মানের বিষয়ও।
অবসরকালীন সঞ্চয়ে মানসিক প্রস্তুতি
সঞ্চয় মানে শুধু টাকা জমানো নয়, মানসিক প্রস্তুতিও জরুরি।
অবসরকালে জীবনযাত্রার ধরন বদলাতে পারে। আয়ের তুলনায় খরচ নিয়ন্ত্রণ শেখাও অবসর প্রস্তুতির অংশ।
সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তব পরামর্শ
অবসরকালীন সঞ্চয় শুরু করতে বড় অঙ্ক দরকার নেই। দরকার নিয়মিততা।
আজ শুরু করলে কাল ফল পাবেন না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সঞ্চয়ই আপনার সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠবে।
নিজের আয় অনুযায়ী পরিকল্পনা করুন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ পরামর্শ নিন। কিন্তু সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেবেন না।
শেষ কথা
অবসরকাল কোনও ভয়ের বিষয় নয়, যদি তার জন্য প্রস্তুতি থাকে।
আজ যে সঞ্চয় আপনাকে একটু কষ্ট দিচ্ছে, আগামী দিনে সেটাই আপনাকে সম্মানজনক ও নিশ্চিন্ত জীবন দেবে।
অবসরকালীন সঞ্চয় মানে ভবিষ্যতের নিজের প্রতি দায়িত্ব নেওয়া। যত আগে এই দায়িত্ব নেবেন, ততই আগামীর পথ সহজ হবে।
গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য
এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
Know more: ইক্যুইটি শেয়ার এবং সাধারণ শেয়ার কি? বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ ভাষায় সম্পূর্ণ গাইড

আমি Samapti Sarkar। ব্যক্তিগত ফিনান্স, স্টক মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড ও স্মার্ট সেভিংস নিয়ে লেখালেখি করি। গত কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ সম্পর্কিত পড়াশোনা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখা তথ্য পাঠকদের জন্য সহজ ভাষায় তুলে ধরছি। এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিটি কনটেন্ট প্রস্তুত করা হয় গবেষণা, ডেটা ও নির্ভরযোগ্য উৎস যাচাই করে। পাঠকদের আর্থিক জ্ঞান বৃদ্ধি ও সঠিক তথ্য দেওয়াই আমার লক্ষ্য।
1 thought on “অবসরকালীন সময়ের জন্য সঞ্চয় কিভাবে করবেন? নিরাপদ ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ গাইড”