শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের আগে যে ঝুঁকিগুলো অবশ্যই এড়িয়ে চলবেন

শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ মানেই রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নয়। এই বাজার যেমন সুযোগ দেয়, তেমনই ভুল সিদ্ধান্ত নিলে মুহূর্তের মধ্যে বড় ক্ষতির কারণও হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। অনেক সময় আবেগ, ভুল তথ্য বা অর্ধেক বোঝা জ্ঞানের কারণে মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন, যা পরে আফসোসে বদলে যায়। তাই শেয়ার মার্কেটে নামার আগে জানা জরুরি কোন কোন ঝুঁকি থেকে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলা উচিত।

আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব শেয়ার মার্কেটের সেই সব ঝুঁকি নিয়ে, যেগুলি এড়িয়ে চলতে পারলে বিনিয়োগ অনেকটাই নিরাপদ হতে পারে। আলোচনা করা হবে ভারতীয় বাজারের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উদাহরণ দিয়ে, যাতে বিষয়গুলি আরও স্পষ্ট হয়।

শেয়ার মার্কেটে আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি
শেয়ার বাজারে সবচেয়ে বড় শত্রু হল নিজের আবেগ। ভয় আর লোভ এই দুই আবেগই বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ করে দেয়। বাজার পড়তে শুরু করলেই অনেকেই আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করে দেন। আবার বাজার একটু উঠলেই ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এই আশায় না বুঝেই বেশি দামে শেয়ার কিনে বসেন।

ভারতের শেয়ার বাজারে এমন ঘটনা বহুবার দেখা গেছে। কোনও একটি ছোট খবর ছড়ালেই বহু মানুষ না যাচাই করে শেয়ার কিনতে শুরু করেন। পরে দেখা যায় কোম্পানির ভিত শক্ত নয়, দাম আবার পড়ে যায়। যারা ভয় বা লোভের বশে সিদ্ধান্ত নেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন।

শেয়ার বাজারে টিকে থাকতে হলে আবেগকে দূরে রেখে বাস্তব তথ্য ও যুক্তির উপর ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে শিখতে হবে।

শোনা কথা বা গুজবের উপর ভরসা করার ঝুঁকি
বন্ধুর পরামর্শ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ইউটিউব ভিডিও কিংবা টেলিগ্রাম চ্যানেলের টিপস দেখে শেয়ার কেনা আজকাল খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই অভ্যাস মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ভারতীয় বাজারে বহু বিনিয়োগকারী শুধু এই কারণে টাকা হারিয়েছেন যে তারা কোনও যাচাই না করেই গুজবের উপর ভরসা করেছেন। অনেক সময় কিছু লোক ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়ো খবর ছড়িয়ে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে নেয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সেই ফাঁদে পা দেন। পরে দাম পড়লে ক্ষতির দায় নিজেরই হয়।

কোনও শেয়ারে বিনিয়োগ করার আগে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার ভবিষ্যৎ, ঋণের পরিমাণ, মুনাফার ধারাবাহিকতা এসব নিজে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

একই শেয়ারে সব টাকা বিনিয়োগ করার ঝুঁকি
অনেকেই মনে করেন একটি ভালো শেয়ার পেলেই সেটিতে সব টাকা ঢেলে দিলে বড় লাভ হবে। বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ শেয়ার বাজারে কোনও কিছুরই নিশ্চয়তা নেই।

ধরা যাক কোনও এক সময় কোনও একটি সেক্টরের শেয়ার খুব ভালো চলছিল। বহু মানুষ সেই একটি শেয়ার বা সেই একটি সেক্টরেই সমস্ত টাকা বিনিয়োগ করলেন। হঠাৎ করে সরকারি নীতি বদলাল বা বাজারে মন্দা এল। তখন একসঙ্গে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হল।

ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হল টাকা ভাগ করে বিভিন্ন সেক্টরের ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা। এতে একটি শেয়ারে ক্ষতি হলেও অন্য শেয়ার সেই ক্ষতি কিছুটা সামলে দিতে পারে।

দ্রুত লাভের আশায় বারবার কেনাবেচার ঝুঁকি
শেয়ার বাজারে প্রতিদিন কেনাবেচা করলেই লাভ হবে এই ধারণা অনেকের মধ্যেই রয়েছে। বাস্তবে এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যারা নতুন, তাদের জন্য এই অভ্যাস ভয়ানক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বারবার শেয়ার কেনাবেচা করলে ব্রোকারেজ, ট্যাক্স এবং মানসিক চাপ সবই বাড়ে। অনেক সময় ছোট লাভের আশায় কেনা শেয়ার উল্টে বড় লোকসানে চলে যায়। ভারতের বহু খুচরো বিনিয়োগকারী এই কারণেই নিয়মিত ক্ষতির মুখে পড়েন।

যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেন, ভালো কোম্পানিতে ধৈর্য ধরে টাকা রাখেন, তারাই সাধারণত ভালো ফল পান।

নিজের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা না বোঝার সমস্যা
সব মানুষের আর্থিক পরিস্থিতি এক রকম নয়। কারও মাসিক আয় স্থির, কারও অনিশ্চিত। কারও সঞ্চয় বেশি, কারও খুব কম। কিন্তু অনেক সময় মানুষ নিজের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা না বুঝেই শেয়ার বাজারে বড় অঙ্কের টাকা ঢেলে দেন।

যদি কোনও ব্যক্তি তার প্রয়োজনীয় খরচের টাকা বা ধার করা টাকা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন, তাহলে বাজার সামান্য নামলেই মানসিক চাপ বেড়ে যায়। সেই চাপ থেকে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

ভারতীয় প্রেক্ষাপটে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের আগে নিজের আয়, খরচ, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজন বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

ছোট কোম্পানির ঝুঁকি না বোঝা
অনেক ছোট কোম্পানির শেয়ার দাম কম থাকে। সেই কারণে নতুন বিনিয়োগকারীদের মনে হয় এখানে বিনিয়োগ করলে বেশি শেয়ার পাওয়া যাবে এবং ভবিষ্যতে দাম বাড়লে লাভ হবে। কিন্তু বাস্তবে ছোট কোম্পানির ঝুঁকি অনেক বেশি।

ভারতের বাজারে বহু ছোট কোম্পানি আছে যাদের ব্যবসা স্থিতিশীল নয়। কখনও ভালো ফল দেখালেও পরের বছর লোকসানে চলে যায়। অনেক সময় তথ্য স্বচ্ছ থাকে না, পরিচালনায় সমস্যা থাকে।

বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক কম হয়। তাই বিনিয়োগের আগে কোম্পানির ইতিহাস ও বিশ্বাসযোগ্যতা বিচার করা জরুরি।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব উপেক্ষা করার ঝুঁকি
শেয়ার বাজার শুধু কোম্পানির ফলাফলের উপর নির্ভর করে না। দেশের অর্থনীতি, সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি, সরকারি নীতি, নির্বাচন এসব বিষয় বাজারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

ভারতে বাজেটের সময়, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সিদ্ধান্ত বা বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বাজারে বড় ওঠানামা দেখা যায়। যারা এসব বিষয় উপেক্ষা করে বিনিয়োগ করেন, তারা হঠাৎ বড় ধাক্কা খেতে পারেন।

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।

স্টপ লস না মানার ঝুঁকি
অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির শেয়ার বিক্রি করতে চান না। তাদের মনে হয় আজ না হোক কাল দাম আবার উঠবে। এই মানসিকতা অনেক সময় ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

ভারতীয় বাজারে বহু উদাহরণ আছে যেখানে মানুষ ক্ষতির শেয়ার ধরে বসে থেকেছেন বছরের পর বছর। অথচ সেই টাকা অন্য ভালো শেয়ারে লাগালে লাভ হতে পারত।

কোন পর্যায়ে ক্ষতি হলে শেয়ার বিক্রি করবেন তা আগেই ঠিক করে রাখা উচিত। এতে বড় লোকসান এড়ানো সম্ভব হয়।

শেয়ার মার্কেটকে জুয়া ভাবার বিপদ
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হল শেয়ার বাজারকে জুয়া মনে করা। কেউ কেউ মনে করেন ভাগ্য ভালো থাকলে একদিনেই বড় টাকা বানানো যাবে। এই ধারণা বাস্তব থেকে অনেক দূরে।

শেয়ার বাজার মূলত ধৈর্য, জ্ঞান এবং পরিকল্পনার খেলা। এখানে ভাগ্যের ভূমিকা থাকলেও সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যারা এটিকে জুয়ার মতো খেলেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল শেয়ার বাজারে আসতে হলে সেটিকে ব্যবসা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা।

শেষ কথা
শেয়ার বাজার ঝুঁকিমুক্ত নয়, তবে সচেতন থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা, গুজব এড়িয়ে চলা, সঠিক তথ্য যাচাই করা, নিজের আর্থিক ক্ষমতা বোঝা এবং ধৈর্য রাখা এই কয়েকটি অভ্যাসই একজন বিনিয়োগকারীকে বড় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

ভারতীয় শেয়ার বাজারে সুযোগ অনেক। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আগে ঝুঁকিগুলো চিনে নেওয়া জরুরি। কারণ এখানে লাভের আগে সুরক্ষাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য

এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক উদ্দেশ্যে লেখা। এখানে উল্লিখিত কোনো শেয়ার কেনা বা বিক্রির সুপারিশ করা হয়নি। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে নিজস্ব গবেষণা অথবা SEBI-র নথিভুক্ত আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন

Know more: সেরা ১১টি আইপিও তালিকা যেগুলি বিনিয়োগকারীদের নজরে

Leave a Comment